মহাদূষণ
দীপংকর লাহিড়ী
[বাল্যে, সেই যখন বাঙলা পরীক্ষার জন্য শব্দার্থ মুখস্থ করার রেওয়াজ ছিল, চমৎকৃত হয়েছিলাম একটি শব্দে । মহামাংস, যার অর্থ নরমাংস । তেমনি পেলাম মহাশঙ্খ, যার অর্থ মড়ার খুলি আর মানুষের হাড় । সেই হিসাবে মননশীল মানুষের মনন প্রক্রিয়ার সঞ্চালনে তার সমাজের সমধর্মী সদস্যদের যে ক্ষয় ও ক্ষতি, যা অবশ্যই দূষণ, তার কি নাম দেওয়া যেতে পারে ! মনে হল মহাদূষণ । আমার এই অনুভব যদি কোনো বিদগ্ধ পাঠককে বিরক্ত করে তবে বর্তমান লেখক ক্ষমাপ্রার্থী । তেমন পাঠকের কাছে নিবেদন ক্ষমার অধিক মহত্তর ধর্ম আর নেই। ]
উনিশ শতকের মাঝামাঝি প্রকাশিত আঙ্ক্ল্ টম্স্ কেবিন ঘৃণ্য দাস প্রথা সম্বন্ধে প্রকৃত চিত্র শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের প্রদেশগুলিতে নয় আটলান্টিকের অপর পারে সুদূর প্রাচ্যের ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় একই সময়ে কোনো দায়িত্বশীল আমেরিকান নাগরিকের চোখে পড়ে নির্বিচার পশুচারণে কীভাবে মরুভূমি পশ্চিমের রাজ্যগুলি থেকে পূর্বের রাজ্যগুলির দিকে আগ্রাসী প্রভাব বিস্তার করছে । বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসের নজরে আনতে একই সঙ্গে আরও কতকগুলি বিষয়ে চোখ পড়ল । শিল্পবিপ্লবের অবধারিত ফলরূপে গ্রাম থেকে নগরে মানুষের ঢল, সঙ্গে তাদের অপরিচ্ছন্ন জীবনচর্যা, খোলা জায়গার আয়তন হ্রাস, মুক্ত বাতাস ও অমলিন জলের ক্রমবর্ধমান অভাব এসবও হল কংগ্রেসের বিতর্কের বিষয় । ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হল প্রথম জাতীয় উদ্যান ইয়েলোস্টোন । প্রকৃতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের এটিই প্রথম পদক্ষেপ ।
সেই থেকে পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আন্দোলন হলেও তেমন কোনো ঐকান্তিক চেষ্টা চোখে পড়েনা সাধারণ মানুষকে পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন করার, বা পরিবেশের প্রতি তাদের আচরণ শুধরানোর । বেসরকারি সংস্থাগুলি তখমও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি পরিবেশের সমস্যাগুলির প্রতি নিয়মিত লক্ষ্য রাখার বা কেউ তার প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করার অভাবে। পরিবেশ দূষণ নামে অধুনা অতি পরিচিত বাক্যাংশ তখনও আসেনি । কিন্তু অনেকে দেখেছেন যে এক ফোঁটা কালি যেমন শুকনো ব্লটিং পেপারে দ্রুত বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় তেমনি পরিবেশে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা একটি ছোট কেন্দ্রক থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে দেরি হয়না । মহাযুদ্ধ বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শস্যক্ষেত্রের, বনভূমির, জলাভূমির ব্যাপক ক্ষতি আর পাশাপাশি প্রযূক্তিবিদ্যার দ্রুত উন্নতি ঘটে গেল । প্রযুক্তিবিদ্যা এনে দিল ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির দ্রুত পুনরুদ্ধারের সুযোগ, খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও অস্ত্রচিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নতি । জন্মের হার বেড়ে চলা আর ক্রমহ্রাসমান মৃত্যুর হার ১৯৫০ সালে পৃথিবীর ২,৫৫৫,৯৮২,৬১১ জনসংখ্যাকে ২০০০ সালে এনে তুলল ৬,০৮১,০০২,৯৩৭-এ । আর তা বেড়েই চলেছে গুণোত্তর হারে । খাদ্যের বৃদ্ধি তো তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখতে হবে, তাই বেড়ে চলল কীটনাশক আর কৃত্রিম সারের ব্যবহার । শুরুতে বোঝা যায়নি খাদ্যের পুষ্টিগুণ কী হারে কমে যাচ্ছে।
আঙ্ক্ল্ টম্স্ কেবিনের মত মানবমননে এযুগের তীব্র অভিঘাত রাশেল কার্সনের Silent Spring গ্রন্থের ১৯৬২ সালে । উপন্যাসের আঙ্গিকে রচিত এই বইটিতে দেখানো হল কীভাবে প্রাণচঞ্চল বসন্তকাল স্তব্ধ হয়ে গেছে কীটনাশকের ব্যবহারে । সেই উপন্যাসের রঙ্গমঞ্চে বসানো হয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন স্থানের পরিবেশের সমস্যাগুলি, নাটকীয় ভাবে এসেছে একের পর এক অধ্যায়গুলি। নামের নমুনা দিয়ে তার পরিচয় এরকম : A fable for Tomorrow, The Obligation to Endure, Elixir of Death, Surface Waters and Underground Seas .. ইত্যাদি । তার পর দলে দলে এল গ্যারেট হার্ডিনের The Tragedy of the Commons (১৯৬৮), পল এহ্রলিশের The Population Bomb (১৯৬৮), ডোনেলা এইচ মেডোর The Limits to Growth (১৯৭২)। এগুলি সরকারি সংস্থাগুলির প্রতি পরিবেশবিদদের তথাকথিত রহস্য উন্মোচক বা জীবনমূলক সাহিত্যের আহ্বান পরিবেশের ক্ষতিকারক মানুষের ক্রিয়াকলাপের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার । ১৯৭৪ সালে এল রবার্ট হেইলবোর্নারের An Inquiry into the Human Prospect । প্রতিপক্ষও কমজোরি নয়, ১৯৮৪ সালে এল কুলিয়ান সাইমন আর হার্মান কানের The Resourceful Earth । তাঁদের বক্তব্য মানুষের এতই ক্ষমতা যে তারা তাদের সব ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে যথাসময়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে ।
সব গ্রন্থই প্রচুর পাঠক পেল, কতকগুলি আঞ্চলিক ক্লাব আসন্ন পরিবেশীয় সংকট নিয়ে যে প্রচার শুরু করল তা ক্রমশ আন্তর্জাতিক সাড়া জাগাল । তা সত্ত্বেও পাঠ্যক্রমের বাহিরে থেকে গেল অনেকে যাদের কাছে পরিবেশ রয়ে গেল অধরা, কিংবা অজ্ঞেয় । অনেকে তো বুঝে উঠতে পারেননা পরিবেশ বিদ্যা বিজ্ঞান, না দর্শনের একটি কল্পনা বা অনুভূতি মাত্র। কারণ তাঁরা বাল্যকাল থেকে জেনে এসেছেন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শুধু সেই পদ্ধতি যা জ্ঞান আহরণ করে পরিমাপন, পূর্বাভাস আর তা যাচাই করার মাধ্যমে । বা পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও অনুমানের পর্য়ায়ক্রমে । পরিবেশের অনুসন্ধানে কোথায় সেই সব ধাপ, কোথায় পরীক্ষণ, কোথায়ই বা পর্য়বেক্ষণ, অনুমান থাকলেই বা! এর পাশাপাশি আবার এক ধরনের মানুষ ভাবতে শুরু করলেন পরিবেশ একটি প্রাণী, শুধু প্রাণীই নয় তা মননশীলও বটে । তাকে বিপন্ন করলে সেও উচিত শিক্ষা দিতে ছাড়েনা । যত দিন এগোচ্ছে ততই এই সব মানুষ দলে ভারি হচ্ছেন । এঁদের মধ্যে যেমন আছেন সাধারণ মানুষ তেমনি আছেন পরিবেশবিদও । তাঁরা শিখাচ্ছেন কী করে পরিবেশকে ভালবাসতে হয়, আর সেই ভালবাসার প্রতিদান পরিবেশ দেয় কীভাবে । তাঁদের লক্ষ্য মানুষের মনে পরিবেশের অনুরণন। তবু পরিবেশের প্রক্রিয়াগুলিকে মননশীলতার পরিচয় বলে না ভেবে অনেকে ভাবতে চান প্রাকৃতিক বিক্রিয়া হিসাবে । উপলব্ধি কথাটি তাঁদের পক্ষে অনেকটাই গুরুভার ।
ইতিহাস বলে মানুষ কিন্তু চিরকাল পরিবেশ সম্বন্ধে এতটা অচেতন ছিলনা । বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই বহু উচ্চারিত শ্লোক সবাই বহুবার শুনেছেন, । মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ মাধ্বীর্ণঃ সন্ত্বৌষধিঃ ... তার পরে আছে মন্ত্র । ব্রহ্মবিদ্যা শিখব বললেই শিক্ষা শুরু করা যায়না, তার উপযুক্ত সময় আছে, আর সেই অনুকূল সময়ের কথা যত সুন্দরভাবে আছে এদেশে, প্রায় ষাট হাজার বছর আগে পরিবেশ সচেতনতা শুরু হলেও এমনভাবে আর কোথাও নেই । ষাটহাজার বছর আগে আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুরু, ছ’ হাজার খ্রীস্টপূর্বে দক্ষিণ ইস্রায়েলের পতনের কারণ নির্বিচারে বনছেদন, ২৭০০ খ্রিস্টপুর্বে গিলগামেশ মহাকাব্য, ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে মোহেঞ্জোদারো, ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বে মোজেজের অনুশাসন, এসব বিচার করেছেন পিথাগোরাস, পরে হেরোডোটাস, বিচার করেছেন প্রথমটি ছাড়া, এসেছে আচরণ বিধি । তবে অন্তরের অন্তঃকরণে প্রকৃতির ক্রিয়াশীলতার অনুরণন সেই উপলব্ধি । কিন্তু সব পরিবেশবিদই যে সেই উপলব্ধি অনুসারে কাজ করেন তা ভাবার মত যথেষ্ট তথ্য এখনও অনেক দূরে । বরং পরিবেশকে সামনে রেখে আক্রমণাত্মক সক্রিয়তা অনেক বেশি স্পষ্ট ।
মহাবিস্ফোরণে বিশ্ব সৃষ্টির পর আমাদের বর্তমান সেকন্ডের কয়েক সেকন্ড ধরে কাল ছিল অতি দ্রুতগতি, সেখানে কালের মাপ ন্যানো সেকন্ডে, অর্থাৎ একশ’ কোটি ন্যানো সেকন্ড যখন একালের এক সেকন্ডের তুলনীয় । সেই কালে যে কোনো বিন্দুতে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে তাকালে আজকের হিসাবে এক বর্তমান সেকন্ডে যিশুখ্রিস্টের জন্মকালে পৌঁছে যাব আমরা। আমাদের হিসাবে কয়েক সেকন্ডের মধ্যে এসে গেল প্রকৃতি । প্রকৃতি তখন দ্রুত পরিবর্তনশীল, জন্মের অব্যবহিত পরেও চলেছে মৌল সৃষ্টি । সব মৌল এসে পড়ার পর প্রকৃতি প্রথম রূপ পরিগ্রহ করল, এল পরিবেশ । সেই পরিবেশ ভূবিদদের অনুসন্ধানের বিষয় । আমরা তার বাঙলা করেছি প্রতিবেশ । আর মানুষ তার মননশীলতার প্রথম রূপ দিল আগুনের নিয়ন্ত্রণে । সেই আমাদের সামাজিক পরিবেশের শুরু। আর এই শুরুর প্রথম থেকেই এসে পড়ল বৈষম্য, একদল অধিকার পেল আগুনের আর বাকিরা তা পেলনা । যারা পেল তারা উন্নত সেই থেকে, বাকিরা রয়ে গেল অনুন্নত, ক্রমে উন্নতিশীল, কারণ তারাও পাকেপ্রকারে আগ্রহী আগুনের নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি আয়ত্তে আনতে । আজও কি তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেছে ? ঘটেনি । ঘটেনি বলেই সমাজবিদ্যা সামাজিক বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত ।
তাই সমাজের পরিবেশ, যা সমাজবিদদের অনুশীলন, সমীক্ষা, পরীক্ষা, সংশোধনের বিষয়বস্তু, তাকে জানতে হলেও চাই প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্বন্ধে জ্ঞান, কারণ প্রাকৃতিক সব প্রক্রিয়া সমাজের ক্ষেত্রে সমভাবে ক্রিয়াশীল । শুধু মানুষের মনন তার রদবদল করে খনিকটা আয়ত্ত্বাধীন করেছে । অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষই জানেননা যে চেতনাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই মননশীলতা, যা সম্ভবত অন্য প্রাণির নেই, হয়তো প্রাইমেট গণের কিছু কিছু প্রজাতির সীমিত পরিমাণে আছে । আর একটি বিষয় অনেকে জানেন না সম্ভবত যে, পাঠ্যক্রমের শিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা নয় । আমরা যাঁদের সাধারণত অশিক্ষিত ভাবি তাঁরা বিদ্যালয় শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও যে যথেষ্ট শিক্ষিত তার প্রমাণ রেখেছেন তাঁদের বৃত্তিগত কার্যকলাপে । কৃষিকর্ম এরকম একটি বৃত্তি ।
সামাজিক পরিবেশে সবচেয়ে বড় যে শক্তি তা হল জনগণ, কারণ তার ভার ভয়াবহ, কিন্তু তা ভয়প্রদভাবে অজ্ঞ । সে অজ্ঞতা ব্যক্তিগত ভাবে অজ্ঞতা নয়, কারণ প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ । কিন্তু অসুবিধা হল কোনো একটি বিষয় লক্ষ্য হলে তার সমবর্তন (polarization) দরকার, আর এই সমবর্তন করে আমদের বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা । কিন্তু একটি ত্রুটি চোখে পড়ছে প্রথাগত শিক্ষাক্রমে, সেখানে পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতনতার ইতিহাসের কোনো আলোচনা নেই, নেই কোনো বিশ্লেষণ । পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যার মত অনেক বিদ্যায় ইতিহাস যতটা জরুরি তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি কিন্তু পরিবেশবিদ্যায় । কারণ বৈজ্ঞানিক অনুমিতির প্রয়োগে পরীক্ষা, নিরিক্ষণ ও অনুমিতির পর আরও একটি ধাপ আছে, তা হল উপলব্ধি । চিকিৎসাবিদ্যায় চিকিৎসকের সাফল্য আসে না সেই উপলব্ধি না এলে । শুধু চিকিৎসাবিদ্যাই নয়, বিজ্ঞানের সব শাখায় সুপরিচিত গন্ডির বাহিরে পদক্ষেপের জন্য দরকার পরিচিত বিষয়ের ঊপলব্ধি । আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রথম তাঁর কাছে নাকি ধরা পড়ে উপলব্ধির স্ফুলিঙ্গ রূপে, অনেক পরে তা প্রমাণিত হয় । তবে সর্বযুগে কোন কোনো মানুষের সেই উপলব্ধি হয়েছে । অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে আমরা তাঁদের মধ্যে নাম করতে পারি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির, ফান গখের, সোয়েইৎজ়ার, পল থোরো, পল ব্রান্টন, হেমিঙওয়ে, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আরও অনেকের । সমাজের প্রধান বল জনমানসকে সচেতন করতে হলে চাই সেই ইতিহাসের সচেতনতা, আর পরিবেশবিদদের তো তা চাইই, তবে তো সার্বিক সমবর্তন সম্ভব !
সেই আদিযুগে মানুষ যখন সবে গোষ্টীবদ্ধ হতে শুরু করেছে তখনকার পটভূমিতে এই উপলব্ধি ছিল যথেষ্ট । হয়তো আমাদের সেই আদি পূর্বপুরুষরা ভেবেছিলেন যে আর সব গোষ্টীবদ্ধ প্রাণীর মতো মানুষও চালিত হবে তাদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে । কিন্তু এই সহজাত প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নিল যুক্তিসংগত চিন্তাভাবনা, যা থেকে এল চিন্তাধারায় যুক্তি পরম্পরা, এবং তা বিকশিত হল মননে, ইংরেজিতে আমরা যাকে rationality বলি, তাতে । আদিযুগে বর্ধিষ্ণু পরিবার থেকে আয়তন বৃদ্ধির ফলে ক্রমে এল গোষ্ঠী । এইসব জটিল থেকে জটিলতর ঘটনা ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র একসঙ্গে ঘটেনি, ঘটেছে আলাদা আলাদা ভাবে । আগুনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিভাজন শুরু হয়েছিল মনুষ্য মন্ডলে তা সমাজের পরিবর্ধিত আয়তনে নানাভাবে ব্যক্তিদ্বারা বা কোনো দলের দ্বারা অন্যকে বা অন্য দলকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টায় প্রযুক্ত হতে শুরু করল । ঔচিত্য (propriety) ও সমস্যার সুষ্ঠু সম্পাদনের অগ্রাধিকার ছিনিয়ে নিতে এগোলো বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা দল । মানবসমাজের আধুনিক সব সমস্যার শুরু সেই থেকে, অর্থাৎ সমাজে দূষণের সূত্রপাত সেই থেকে । তবে এসম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণের প্রয়াসের আগে আমাদের দেখে নেওয়া দরকার জৈবমন্ডলের বিভিন্ন বাস্তব্যধারার সঙ্গে মানুষের সমাজের সাদৃশ্য কোথায় আর বৈসাদৃশ্য কতটা ।
প্রথমেই আমাদের একটা কথা মনে রাখা দরকার _ জীবজগতে মানুষের জীবরূপে গুরুত্ব । মেরুদন্ডী প্রাণিদের উদাহরণে বলি _ ঘোড়া ইকুয়াস (Equus) গণের একটি প্রজাতি, অন্য প্রজাতিগুলি হল গাধা ও জেব্রা । যদি গৃহপালিত পশুর উদাহরণ নিই, তবে গরু ছাগল, এক জীবপরিবারের সদস্য, কিন্তু তারা আলাদা হয়েছে গণ (genus) পর্যায়ে । মানুষের গণ হোমো (Homo), প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স্, আমরা এযুগের মানুষ বস্তুত একটি উপপ্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স্ সেপিয়েন্স্ । গরুর ক্ষেত্রে ভারতের পবিত্র গাভি, ইংরেজ আমেরিকানরা যার নাম দিয়েছে ব্রাহ্মণ, তা একটি উপপ্রজাতি । প্রকৃতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যে জৈব রাজ্য সেখানে কোনো উপপ্রজাতির জনসংখ্যা কিন্তু মানুষের ধারে কাছে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো পর্বেই তা ছিলওনা। অনেকের মনে হতে পারে ডাইনোসরের কথা, কিন্তু এখানে জেনে রাখা ভাল যে ডাইনোসর কোনো জীববৈজ্ঞানিক নাম নয়, একটি প্রচলিত নাম _ সরীসৃপের বিভিন্ন উপপরিবার (subfamily) এবং গণ-এর নানান প্রজাতির নানান উপপ্রজাতির প্রাণির সমাহার । ভূবৈজ্ঞানিক ইতিহাস বলে ডাইনোসরদের দাপট ছিল প্রায় ১৫ কোটি বছর । কিন্তু এককভাবে কোনো প্রজাতির মেয়াদ ৫০ লক্ষ বছর ছিল কিনা সন্দেহ । সেক্ষেত্রে মানুষের উপপ্রজাতি ২ থেকে ২.৫ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তনের পথে সার্বিকভাবে সমানে এগিয়ে চলেছে, অষ্টাদশ শতকে ১০০ কোটি থেকে ২০০৮ সালের এপ্রিলে তার জনসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬৬৭ কোটি ।
দ্বিতীয়ত, সব প্রজাতির বিলুপ্তি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, বিলুপ্তি না হলে নূতন প্রজাতি আসত না । মানুষ তার অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক ক্ষমতা মননের অনুশীলন পরিশীলনে ক্রমান্বয়ে উন্নত হয়ে তার অবধারিত বিলুপ্তিকে প্রতিহত করেছে । কিন্তু এই বাস্তব সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিপন্ন হয়েছে শুধু জৈব বৈচিত্র্য নয়, অজৈব প্রকৃতিও । তা কেন এবং কীভাবে ঘটছে তা বিচার করতে নেমেছেন সমাজবিদ্যার গবেষকরা । তা করতে গিয়ে তাঁরা বিস্মিত হয়ে দেখছেন যে আমরা কখনও আমদের সার্বিক সামাজিক শৈলির মূল বিষয়গুলি সম্বন্ধে অবহিত নই, বরং আমরা যা পড়ি আর শুনি তা ব্যক্তিবিশেষের চিন্তা ভাবনা । সেখানেও যে শুনছে বা পড়ছে তার মানসিকতা দিয়ে তার চিত্র গড়ে উঠছে ।
প্রসঙ্গত ভাষা আর স্মৃতির কথা আসে । ভাষা না থাকলে স্মৃতি কতদূর আসত সেসম্বন্ধে মনোবিজ্ঞানীদের নানান জনের নানা মত । ভাষার সূত্র ধরে ঘটনার পারম্পর্য মনে গ্রথিত হয় নেক্টা গ্রামোফোনের রেকর্ডের মতো । তাকে উদ্দীপন করলে তবে সে স্মৃতি জাগ্রত হয় । যদিও শুধু ভাষা নয় । চিত্রশিল্পী আকৃতিকে মনে ধরে রাখতে পারেন, ক্যামেরার মত সর্বদা তাঁর দৃষ্টি মডেলের প্রতি নিবদ্ধ থাকেনা । সুরশিল্পীরা তাঁর স্মৃতিতে সুর ধরে রাখতে পারেন বলেই দরকারে তা জাগ্রত করে নিজেও সুরসৃষ্টি করতে পারেন । চিত্রকল্প বা সুর ধরে রাখার ক্ষমতা সবার সমান নয় । অর্থাৎ স্মৃতিশক্তি সবার সমান প্রখর নয় । স্বজ্ঞার প্রধান ধারক স্মৃতি, তাই যার স্মৃতিশক্তি প্রখর তার স্বজ্ঞাও উন্নত । উন্নত স্বজ্ঞা হলে চিন্তা স্বচ্ছ হয় । সুতরাং শোনা বা পড়ার মাধ্যমে যে তথ্য আহৃত হয় তা কতটা ইতিবাচক আর কতটা নেতিবাচক, কতটা বিশ্বাসযোগ্য আর কতটা বিভ্রান্তিকর তা বিচার করার ক্ষমতা জন্মায় । ব্যক্তিবিশেষে এই ক্ষমতার তারতম্য অনেক বলে সমাজের সাধারণ বুদ্ধি সবসময় ইতিবাচক উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটায় না । বস্তুত সমাজের সাধারণ বুদ্ধি বলে কিছু নেই ।
বহু ব্যক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক সিদ্ধান্তে গঠিত হয় সমাজের মূল উদ্দেশ্য । যদি শুধু দুটি কি চারটি মানুষ কোনো কথা বিশ্বাস করে তবে তার কোনো প্রতিঘাত ঘটেনা, তেমনি একটি গ্রন্থে কিছু ছাপা হয়ে যদি ব্যাপকভাবে পঠিত না হয় তবে সমাজের বক্তব্যরূপে তার কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটেনা । কিন্তু কোনো বক্তব্য যদি বারবার প্রচারিত হয় তবে তা একটি সত্য হয়ে দাঁড়ায়, যদিও সে সত্যের নিরপেক্ষ প্রকৃতিতে বাস্তবতা নাও থাকতে পারে । অথচ সমাজে তা যুক্তিসিদ্ধ বলে গৃহীত হতে পারে । অর্থাৎ কোনো যুক্তিসিদ্ধ সিদ্ধান্ত ১০০% প্রকৃত সত্য নয় । মানব সমাজের সমবায় মননে দূষণ অনুপ্রবেশের এটা একটি ফাঁক । দূষণ ইচ্ছাকৃত হতে পারে, আবার ভুল করেও হতে পারে । চলনে বলনে আমরা অনেকটা আমাদের মননশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কথোপকথনে কিছু নেতিবাচক বিষয় ঢুকে পড়ে । টিমথি গার্টন অ্যাশ এই ভ্রান্তির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন ‘The difference was not, to be sure, between the pure white of a completely free press and the solid black of a wholly unfree one, but between the light gray of the largely free and the dark gray of the largely unfree. In East Germany, that gray was pretty dark.’
সব ব্যক্তমানবের মানসে এমন কী, প্রজন্ম্বের মানসে কতকগুলি স্বতঃসিদ্ধ মত আছে । তার কিছু কিছু মনের অচেতন বা অবচেতন ধারণা যা প্রজন্মের পরম্পরায় বাহিত হয়ে চলেছে, সাধারণ মানুষ (অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ নন এমন মানুষ) তা কোনোদিন বিচার করার কথা ভাবেননি । যেমন সাধারণ বিশ্বাস যে সব পথ্যে উপযুক্ত পরিমাণে ভিটামিন আছে । ভিটামিন সেক্ষেত্রে একটি অনির্দেশ্য সত্ত্বা । যিনি বলছেন আর যিনি শুনছেন তাঁরা জানেননা ভিটামিন কত রকম হয়, এবং সুস্থ শরীরে তার কোনোটি বিপজ্জনক কিনা। কলকাতার বনেদী মধ্যবিত্তদের (যাদের মধ্য থেকে একদা বেরিয়েছিলেন বুদ্ধিজীবিরা) দেখেছি অনেকের ধারণা প্রোটিন আর মাংসল দেহ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত । তাঁদের ধারণাই নেই বহু রোগের কারক বিশেষ বিশেষ প্রোটিন । মননে দূষণের কারণ এমন অনেক দৃঢ়মূল ধারণা যার প্রচারে সংবাদপত্রের বিজ্ঞানবিষয়ক রচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেগুলি লেখক দায়সারাভাবে লেখেন । ভ্রান্ত বা অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে এইসব দূষণ কিন্তু প্রকৃত দূষণ, তার অপকার করার ক্ষমতা কিন্তু উদ্দেশ্য প্রণোদিত দূষণের সমান ।
মননভিত্তিক জীবনচর্যার মধ্যে ইতিবাচক আর নেতিবাচক দু ধরনের উপাদানই থাকে, ফলে সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সব সংস্থাগুলিতে সদস্যদের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক । নেতিবাচক উপাদানটি সরিয়ে নিতে পারলে দ্বন্দ্ব ঘুচে যায় । যাঁরা রাজনীতি করেন অনেকসময় তাঁরা সচেতনভাবে দ্বন্দ্বটি বজায় রাখেন, কারণ তাহলে সেই বিশেষ সিদ্ধান্তে মতৈক্যে পৌঁছন যায়, যা তাঁরা চাননা । যে কোনো সামাজিক বিষয়, যেমন সংরক্ষণ, এরকম একটি বিষয় (theme) । অনন্তকাল ধরে বিশেষ কতকগুলি শ্রেণীর জন্য কতকগুলি সামাজিক সুযোগ সুবিধার সংরক্ষণ সেই শ্রেণীগুলিকে সমৃদ্ধ করে কিনা তা বিতর্কের বিষয় । এই বিষয়ের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই উপাদানই আছে। যুদ্ধের পর বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক । দেশবিভাগের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েক বছর তার দরজা খুলে রেখেছিল উদ্বাস্তু ছাত্রদের জন্য । কিন্তু তা নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াত যদি তা আরও সাত দশক খোলা থাকত । নেতিবাচক বিষয় নিজে দূষণকারী হয়ে আরও পাঁচরকম দূষণের পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারে, যেমন জৈব মন্ডলে একটি দূষক বহুমুখী দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ব্যক্তিগত উপাদানরূপে নেতিবাচক যুক্তি ক্রমে সমবায়িত হতে হতে সমাজের মননের গভীরে শিকড় বিস্তার করে সমগ্র সমাজের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। এমন সময়ও আসতে পারে যখন যুক্তিবান মানুষও ধন্ধে পড়ে যান সত্যকে সত্য রূপে চিনে নিতে । বিভিন্ন শ্রেণীর এজাতীয় উপাদান পরিণামে সমাজের অবনতি ঘটায় । এই নেতিবাচক উপাদানগুলির প্রচলিত নাম সংস্কার, যা প্রায় সর্বদা নেতিবাচক উপাদান বুঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘কুসংস্কার’ কথাটি দিয়ে । অথচ সংস্কার কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘সু’ অর্থাৎ ইতিবাচক দিকটি । অবশ্য বিতর্কের খাতিরে অনেকে বলতে পারেন সম্যকভাবে করা যে কোনো ক্রিয়াই তো সংস্কার ! তা মানুষ কি সম্যকভাবে হত্যা করতে পারেনা ? অবশ্যই পারে । মানুষ মারাটা প্রথা হলে তাকে সংস্কার বলে মানতেই হয়, যেমন এককালে নরবলি সংস্কার ছিল । তবু দেখা যাচ্ছে বহুব্যবহারে অনেক ইতিবাচক শব্দ নেতিবাচক হয়ে গেছে । মহাজন এরকম একটি শব্দ ।
জীবজগতে অগ্রগতিকে বলে বিবর্তন, কিন্তু মানবসমাজে অগ্রগতিকে বলে উন্নতি । কিন্তু এই উন্নতি সামগ্রিক নয়, এককভাবে অনেক ব্যক্তির উন্নতির সামগ্রিক (integrated) রূপ মাত্র । কারণ চিন্তা মানুষের একক প্রক্রিয়া, সামাজিকভাবে কোনো চিন্তাপ্রক্রিয়া হয়না, তা হওয়া সম্ভবও নয় । এযুগে চিন্তাহীন সামাজিক ক্রিয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ধর্মোন্মাদনায় সম্পাদিত ক্রিয়া । সে ধর্ম শৈব, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্ম যেমন হতে পারে তেমনি কোনো রাজনৈতিক মতবাদও হতে পারে । চিত্রশিল্পে শৈলী সম্বন্ধে মতের প্রভেদের চূড়ান্ত পরিণতি গ্যগাঁর সঙ্গে ফান গখের কলহ, যার বর্ণনা আছে Lust for Life গ্রন্থে । ভারতের সনাতন ধর্ম ছাড়া আর সব ধর্মই কোনো না কোনো ধর্মগুরুর দ্বারা প্রচারিত । ভারতের সনাতন ধর্ম বলতে অনেকের মনে হতে পারে হিন্দুধর্ম, কিন্তু হিন্দু তো পারসিকদের দেওয়া নাম । ব্রাহ্মণ্য, শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, তার কোনটি তথাকথিত হিন্দুধর্ম নয়? কারণ সব কিছুরই উৎপত্তি তো সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্বমীমাংসায় । চার্বাকপন্থী সত্যকামের বশিষ্ঠ পরিচয় দিয়েছিলেন নাস্তিক ব্রহ্মর্ষি বলে । যা লক্ষ্যণীয় তা হল, শুধু ভারতীয় ধর্মই নয়, খ্রিস্ট ধর্ম, ইহুদিদের জুডাইজম, ইসলাম, বাহাই, সব ধর্মেই ব্রহ্ম এক এবং অনুপম । শিন্টোইজম, কনফুসীয় ধর্ম এবং জৈনধর্ম ব্রহ্ম সম্বন্ধে বিশেষ কোনো ধারণা পোষণ করেনা, তাদের উদ্দেশ্য জীবনচর্যায় বিশেষ কতকগুলি আচার পালন ।
স্বজ্ঞা (intuiton) এই প্রসঙ্গে আর একটি বহুব্যবহৃত শব্দ । স্বজ্ঞা কোনো প্রবৃত্তি (instinct) নয়, কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া (conditioned reflex) নয়, কোনো শারীরিক ক্রিয়া নয় । তা বৌদ্ধিক, অন্যগুলি শারীরিক ক্রিয়া । স্বজ্ঞার সংজ্ঞা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে ভারতের বৈশেষিক দর্শনে, তবে তা এখানে সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয় । ইয়োরোপীয় দার্শনিকদের বিশ্লেষণ যথেষ্ট জটিল হলেও তাঁদের অনেকে অভ্যাসের পিছনে স্বজ্ঞার ভূমিকার কথা বলেছেন । এই অভ্যাস আবার ধর্মীয় আচারের উৎস হতে পারে। আচার যদি নেতিবাচক, এক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক হয় তবে তা হয়ে দাঁড়ায় দূষণ । স্বজ্ঞার একটি পীঠ আছে, তা হল ব্যক্তিসত্ত্বার মগ্নচৈতন্য । শারদ প্রভাতে রবিকিরণের স্বর্ণাভা, সাগরসৈকতে সাগরের নীলিমায় মনের উল্লাস, ঘনবনানীর সর্বব্যাপী ঝিল্লিরবের অভিঘাত কিংবা সূচীভেদ্য নীরবতার অস্বস্তি এগুলির কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা যায়না, কিন্তু মন প্রাণ দেহ দিয়ে অনুভব করা যায় । তবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এই অনুভূতির মাত্রা আলাদা । কারও বেলায় তা অভিভূত করে, কারও বেলায় তা শুধু ছুঁয়ে যায় । স্বজ্ঞার সুবিস্তীর্ণ এলাকায় সর্ববিধ আবেগ বা ভাবের সঙ্গে যুক্ত মানসিক ক্রিয়ার গতিবিধি, সেখানে মননের বস্তু নিরপেক্ষ বিচার প্রশমিত । তাই এসব বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে তারতম্য ঘটে থাকে । এজন্য মানবসমাজে একটি পারিসাংখ্যিক প্রক্রিয়ায় কোনো শিল্পনিদর্শন, কোনো সঙ্গীত ইতাদি সম্বন্ধে চূড়ান্ত মতামতের সমবর্তন ( polarization) ঘটে । ফলে মানুষের মনোরাজ্যে নানারকম বিভাজন ঘটে থাকে। আগুনের নিয়ন্ত্রণ আবিষ্কারের পর যেমন হয়েছিল তেমনি উন্নতমনস্ক ও ভিন্ন ভিন্ন মানের উন্নতিকামী মানুষের বিকাশ ঘটে । পাড়ার দুর্গোৎসব থেকে শুরু করে বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, শিল্পী সম্মেলন, সঙ্গীত সম্মেলন ইত্যাদিতে একটি পাইয়ে দেওয়া ও বাধিত হওয়ার কূটসম্পর্ক গড়ে ওঠে । আধুনিক সভ্যতায় এটি কূটনীতি নিয়ন্ত্রিত দূষণের সর্বপ্রধান ক্ষেত্র, আঞ্চলিক পরিসীমা থেকে প্রাদেশিক, রাষ্ট্রীয় এবং সব শেষে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত যার ব্যাপ্তি । বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন পুরস্কার তার একটি অতিপরিচিত নিদর্শন । অনেকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সম্মান নোবেলকেও সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন ।
তবু সাধারণ অভিধানে স্বজ্ঞার অর্থ নির্দেশ করে মগ্নচৈতন্য বা অবচেতন বলে । যেন মগ্নচৈতন্য আর অবচেতন সমার্থক । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয় । এসব ক্ষেত্রে বোঝা যায় শব্দের মাধ্যমে সব কিছু বোঝানো যায়না, কোনো জিনিষ বুঝতে গেলে চাই চৈতন্যের আর একটি স্তর, যার অর্থবোধক কাছাকাছি শব্দ উপলব্ধি । ভারতীয় দর্শনের একটি হল যোগশাস্ত্র । এই শাস্ত্রে বিস্তারিত নির্দেশ আছে কীভাবে মগ্নচৈতন্যকে উদ্দীপিত করা যায় । মগ্নচৈতন্য উদ্দীপিত হলে ব্যক্তি চৈতন্যের সঞ্চার ঘটাবার ক্ষমতা অর্জন করে । যোগশাস্ত্রের প্রক্রিয়া রীতিবদ্ধ প্রক্রিয়া । কিন্তু সেই পথে না গিয়েও মগ্নচৈতন্য উদ্দীপন যে সম্ভব তার প্রমাণও আছে । ছয় শতাব্দীর প্রাচীন টমাস কেম্পিসের গ্রন্থ Imitation of Christ মগ্নচৈতন্য উদ্দীপনে খ্রিস্টানরা ব্যবহার করে আসছেন । তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার অনুশীলনে এভাবে উদ্দীপিত মগ্নচৈতন্যের উদ্ভাসে উদ্ভাসিত জার্মান ফন বাইৎস্যাকারের History of Nature, মগ্নচৈতন্য কতটা উদ্ভাসিত হলে এরকম বই লেখা সম্ভব তা বিচার করতে গেলেও দরকার এমন পাঠকের যাঁর চৈতন্য অনেকটা এগিয়ে । কিন্তু যাদের চৈতন্য অবচেতনের খাঁচায় আবদ্ধ, History of Nature-এর একটি অনুচ্ছেদও তার বোধের বাহিরে । চিত্রশিল্পীদের মধ্যে ফান গখ, ল্যত্রেক, গ্যগাঁর নাম করা যায় যাঁরা তাঁদের মগ্নচৈতন্যকে সঞ্চারিত করতে পারতেন । তবে স্বজ্ঞার পীঠ (পতঞ্জল যার স্থান নির্দেশ করেছেন হৃদয়ে অনাহত চক্ররূপে) সম্পূর্ণ উদ্দীপিত না হলেও চিন্তা করতে গেলে স্বজ্ঞা খনিকটা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বুদ্ধিলব্ধ ধারণাগুলি সুসংবদ্ধ করতে । ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে পরিস্রুত হয়ে স্বজ্ঞাপীঠে সঞ্চিত হবার আগে একটি পারিসাংখ্যিক প্রক্রিয়ায় আমাদের মনোরাজ্যে অভিজ্ঞতা হয়ে জমা হয়, এই অভিজ্ঞতাসিঞ্চিত বুদ্ধিকে বলে প্রজ্ঞা । প্রসঙ্গত কিন্তু সঙ্গোপনে বলি শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এরকম একটি গ্রন্থ যা Imitation of Christ-এর মতো স্বজ্ঞাপীঠ উদ্দীপনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহু শতাব্দী ধরে শুধু ভারতে নয় বিদেশেও ।
স্বজ্ঞাপীঠেই উপলব্ধির বিকাশ। স্বজ্ঞাপীঠ সম্পূর্ণ উদ্দীপিত না হলেও প্রজ্ঞা বা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাহিরের যা কিছু তার যেটুকু সার সেখানে সঞ্চারিত হয় তাতে কোনো ঘটনা বা বস্তুর মধ্যে বেমানান কিছু থাকলে তা অনুভূত হয় বা চোখে পড়ে । বাক্যালাপে বা কোনো ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণে বেখাপ্পা কিছু থাকলে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি তা শুধরে নেবার চেষ্টা করেন । এভাবে কথাবার্তা পোশাকআশাকে শৈলীর উৎপত্তি হয় । চিন্তাধারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও দুটি ব্যক্তির মধ্যে চিন্তার সাযুজ্য শৈলীর অন্যতম অবদান । বহু একক ব্যক্তির চিন্তাধারা একই শৈলী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে সামজিক শৈলীর বিকাশ ঘটে । দুটি আলাদা সমাজ, আমরা বলতে পারি জাতি (nation), তাদের মধ্যে সামাজিক শৈলীর পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা বেশি । শৈলীর সঙ্গতি দিয়ে জাতি চিহ্ণিত বলে জাতির আবির্ভাবের জন্য চাই একটি ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে নির্দিষ্ট ভূখন্ড । ভূখন্ড কৃত্রিম ভাবে বিভাজিত হলেও শৈলীর সম্পূর্ণ বিভাজন ঘটে দুটি সুনির্দিষ্ট জাতির আত্মপ্রকাশ সহজে হয়না । আগে যদিও তা দুচার প্রজন্মের মধ্যে সম্ভব হত, এযুগে ইন্টারনেট ও মোবাইলের সংযোগসূত্রের জোরে পুরানো শৈলী সুদীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকার সম্ভাবনা ।
অবশ্য মগ্নচৈতন্য মাত্রই স্বজ্ঞা নয়, তার মধ্যে অবচেতনও আছে । এই অবচেতনে বাল্যকালে দূষণ জমে থাকতে পারে যা বিভিন্ন মানসিক রোগের কারণ হয়ে পরিণত জীবনে ব্যক্তিবিশেষকে, তার পারিবারিক জীবনকে, ক্ষেত্রবিশেষে তার চারপাশের মানবিক পরিবেশকে বিব্রত করতে পারে । এইসব মানুষ ছিটগ্রস্ত, বাতিকগ্রস্ত ইত্যাদি নামে চিহ্নিত হন । এরকম ঘাটতির গভীরতা কিন্তু বিরাট । প্রবন্ধের এই জায়গাটি লিখতে গিয়ে আমার প্রবন্ধের শিরোনামের কথা মনে হচ্ছে । প্রকৃতির কাছ থেকে আমাদের আদিম পুরুষ হয়তো পেয়েছিলেন মনন, কিন্তু তার যাদুস্পর্শে অনন্তে বিস্তারলাভ করে মননের রাজ্য হয়ে উঠেছে মহা । ফলে মানুষের কাজকর্ম ভাবনাচিন্তা সব কিছুই অনন্তে বিস্তারলাভের জন্য উন্মুখ । অবচেতন মনের ক্ষেত্রও অনন্ত, তাই সেখানে ঘাটতির প্রকৃতিও অসংখ্য ধরনের । মনোরোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা একটা বয়স পর্যন্ত counselling করে থাকেন, কিন্তু সেই বয়সের ঊর্ধ্বতম সীমা খুবই কম । একটু বেশি বয়সে, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর counselling কতটা সার্থক সে সম্বন্ধে নিজেরা সন্দিহান বলে তা না করে flunil জাতীয় কিছু ওষুধ ব্যবহার করেন যা রোগীর রোগ নির্মূল করেনা । L. Ron Hubbard এই রোগ সারাবার জন্য যে পদ্ধতি চালু করেন তা Scientology নামে পরিচিত । এই পদ্ধতি অবচেতনকে মোছা স্লেটের মতো পরিষ্কার করে দিতে পারে এটাও পরীক্ষিত সত্য । কিন্তু এই সত্যকে অবলম্বন করে দূষণ ঢুকে পড়ল মানব সমাজে । মুছে দেওয়া স্লেটে নূতন অভিঘাত কতটা ভয়ানক হতে পারে তার উদাহরণ হিসাবে অনেক মনোবিদ হিটলার ও স্ত্যালিনের নাম করেন । ব্যক্তিবিশেষ তার রাজনৈতিক ও পুঞ্জত শারীরিক শক্তি দিয়ে বলতে পারে ‘আমিই একমাত্র সত্য, বাকিসব মিথ্যা’ । এদেশেও তার উদাহরণ মিলবে । বর্তমানে Scientology একটি ধর্ম, ক্যালিফোর্নিয়ায় Church of Scientology International আছে এবং পৃথিবীর সর্বত্র, কলকাতায় শুদ্ধ তার শাখা আছে । কিন্তু বহু দেশে তা আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ এই বিদ্যার মাধ্যমে মনোরোগীর মগজ ধোলাই করে তাকে সমাজবিদ্বেষী কাজে লাগান হয়েছে ।
এই প্রসঙ্গে আক্কেল বা কান্ডজ্ঞানের কথা এসে পড়ে । কান্ডজ্ঞান অর্থ বিচক্ষণতা, যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় প্রতি পদক্ষেপে যুক্তিসিদ্ধ চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে । আমদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে বিচক্ষণতা কাজে লাগে, অভিজ্ঞতা সেই বিচক্ষণতাকে পরিশীলিত করে । স্বভাবতই প্রজ্ঞাবান মানুষের বিচক্ষণতা বেশি । অর্থাৎ বিচক্ষণতা একটি ইতিবাচক গুণ । ভাল খারাপ, পাপ পুণ্য এগুলি বিচক্ষণতা দিয়ে নির্ধারিত হয় । বিচক্ষণতার সঙ্গে অভিজ্ঞতা যোগ করে আমরা কোনো সমস্যা বুঝতে অনেকটা এগোতে পারি । বিচক্ষণতা নিরপেক্ষ, প্রবণতাহীন, দায়বদ্ধ এবং নাগরিক সমস্যা সংক্রান্ত । ইংরেজি ও বাঙলা বহু প্রবচন বিচক্ষণতা সম্ভূত, A stitch in time saves nine, a rolling stone gathers no moss, এক মাঘে শীত পালায়না, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয় কংবা অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী । কিন্তু প্রশাসনের এবং বিভিন্ন সংস্থার পরিচালকদের কান্ডজ্ঞান অবলম্বন করে দূষণ ঢুকে পড়েছে বহু দেশে । সেখানে কান্ডজ্ঞানের অভাব যেমন বিপত্তি ঘটায় তেমনি ঘটায় ইচ্ছাকৃত অভাব প্রদর্শন । তবে এই প্রসঙ্গে আসার আগে আমরা আর একটি কথায় আসি ।
সততা কথাটি স্বভাবতই আসে কান্ডজ্ঞান প্রসঙ্গে । আমরা এটা বুঝি যে সততা আমাদের মনন সম্বন্ধীয় সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় । কারও যদি এই সম্পূর্ণতা থাকে তবে আমরা তার কোনো কথা বা পরামর্শ মান্য করি । সততা আমাদের ইতিবাচক চিন্তাকে নেতিবাচক ভাবনা থেকে ছেঁকে তোলে, কোন কাজ অনস্বীকার্য তা বুঝতে সাহায্য করে এবং সন্তুষ্টি এনে দেয় । তাই আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে সৎ হবার, সৎ কাজ করার, সৎচিন্তা করার আকাঙ্খা থাকে । অন্যভাবে দেখলে আমাদের অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হওয়ার, প্রবঞ্চনাকে প্রতিরোধ করার, ভন্ডামি পরিত্যাগ করার এবং ধান্দাবাজি পরিত্যাগ করার জন্য সততার প্রতি আকর্ষণ । সাধারণত আমরা নিজেরা যেমন সৎ হতে চাই তেমনি যাদের সঙ্গে আমাদের চলাফেরা ও সামাজিক আদানপ্রদান, তাদের মধ্যেও সততা আশা করি । জনসাধারণের বৃহত্তম অংশই চায় এক সৎ জাগতিক পরিবেশ । যদিও সব স্বাভাবিক মানুষ সাধারণ অবস্থায় চায় সত্য কথা বলতে সত্য কথা শুনতে, তবু সমাজে সততার যথেষ্ট অনুশীলন হয়না । পূর্ব সংস্কার, অহমিকা, অবিশ্বাস, ভীতি, ঠকানোর লোভ প্রায়শ আমাদের স্পষ্ট কথা বলার আগ্রহ দমিত করে । সমাজের যুক্তিসিদ্ধ শৈলীর বিকৃতি থেকে আমাদের ব্যক্তিগত সততার গভীর এবং সুদুরপ্রসারী অবনমন ঘটে । সততা আর কান্ডজ্ঞান একটি অপরটির প্রতিরূপ। সততার মূল্য শিখতে কান্ডজ্ঞান দরকার, আবার কান্ডজ্ঞান না থাকলে সৎ হওয়া যায়না । তবে কান্ডজ্ঞান আর সততা ঠিক এক বা সমার্থক নয় । কান্ডজ্ঞান হল একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, আর সততা হল কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করার ঝোঁক । সুস্থ উন্নতিশীল সমাজে সবরকম আদানপ্রদানে এই দুটিই দরকার কারণ এদুটি পরস্পরে প্রতি সেই বিশ্বাস বা আস্থা তৈরি করে যার অভাবে উন্নতি ও সমাজের স্বাস্থ্যের বিঘ্ন ঘটে । তবে সততা কিন্তু বোকামি নয়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় কিছু ব্যক্তির চেষ্টা সৎ ব্যক্তির সততার সুযোগ নিয়ে স্বার্থ রক্ষা করা বা কায়েম করা, যারা আর সবাইকে বোকা ভেবে নিয়ে এগোয়। কিছুকাল, পাঁচ, দশ, পনের বছর এভাবে মানুষকে বোকা বানানো গেলেও পরিণামে তা অতিচালাক ব্যক্তিদের বিনাশের কারণ হয় ।
সততার প্রসঙ্গে সত্য কথাটি এসে পড়ে, যার উলটো দিকে মিথ্যা । এই মিথ্যা নানাভাবে সত্যকে কলূষিত করে । সত্যকে গুলিয়ে দিয়ে বুদ্ধিমান মানুষকেও বোকা বানাবার মতো নানারকম কূটভাষের কথা আমরা শুনি যার একটি বহুল প্রচলিত জেনোর (? খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০) উক্তি, ইংরেজি অনুবাদে যা দাঁড়ায় : All Cretans are liars. I am a Cretan. Therefore I am lying. But if I am lying, then I am not a Cretan, and I might be telling the truth. But if I am telling the truth I must be lying । এই উক্তির বহু রকমফের প্রচলিত আছে আড়াই হাজার বছর ধরে । সংস্কৃত ভাষায় উদ্ভট শ্লোকের মধ্যে এজাতীয় অনেক উক্তি আছে । এ ধরনের উক্তি বিভ্রান্তি ঘটায় । কিন্তু তা সত্ত্বেও সেগুলিকে মিথ্যার সঙ্গে সমীকরণ করা যায়না ।
ব্রিটিশ সরকার শিক্ষকদের বিশ্রী রকম স্বল্প বেতনক্রম ধার্য করেছিল, এতই স্বল্প যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে বা পরে, এমনকী স্বাধীনতার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত স্কুল, কলেজে উপযুক্ত যোগ্যতার শিক্ষকের অভাব ছিল । যাঁরা যোগ্য ছিলেন তাঁদের অনেকে আয় বাড়াবার জন্য প্রাইভেট টিউশানের চক্র সৃষ্টি করেন যা কালক্রমে দুষ্টচক্রে পরিবর্ধিত হয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে সঙ্কট আনে তার আর নতুন করে বর্ণনা দেবার দরকার নেই । দেখাদেখি অনেক চাকুরিজীবী অনুরূপ বাড়তি অর্থপার্জনের জন্য নানান উপায় অবলম্বন করেন । সততার যে অভাব সৃষ্টি করে গিয়েছিল ব্রিটিশরা তার আগাছা ষাট বছরের চেয়ে বেশি প্রাচীন স্বাধীনতায় তা পালামৌ-এর জঙ্গলকেও ছাড়িয়ে গেছে । দক্ষিণ কলকাতার একটি হেড পোস্ট অফিস খোলে সকাল আটটায় খাম পোস্টকার্ড বিক্রির জন্য আর স্পিড পোস্ট নেবার জন্য । প্রতিবারই চোখে পড়েছে কাউন্টারে কেউ নেই । অনেকবার ডাকাডাকির পর কর্মীটিকে পাওয়া গেলেও আমার আগে কোনো লোক না থাকা সত্ত্বেও সময় লাগে অন্তত দশ মিনিট। বেশ ক-বার এই অভিজ্ঞতার পর উপরমহলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর বোধহয় কিছু নির্দেশ এলে সকাল আটটা থেকে কাউন্টারে কারও উপস্থিতি সুনিশ্চিত করা হ্য় । আমার শেষ ওখানে যাওয়া এই ঘটনার পর । সেখানে গিয়ে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল । কর্মীটি কাউন্টারের পাশে দেওয়ালে সঙ্গে ঘেঁসে চেয়ারে বসে আছে, বাহির থেকে চোখে পড়েনা । আমার ডাকাডাকিতে তার কোনো সহকর্মী তাকে সক্রিয় করল । সে তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল আমি কী চাই । উৎকোচ গ্রহণের কথা সবাই জানেন, কিন্তু এটি তো সেরকম কোনো ক্ষেত্র নয়! ডাকবিভাগের নানান দিকে এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবার সময় আমাদের এদিককার টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার কারণে একটি চিঠি স্পিড পোস্টে পাঠাতে হয় । খরচ পড়ে দেড়শ টাকা । রশিদ নিয়ে যখন নিশ্চিন্তভাবে বসে আছি যে চিঠিটা নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে, তখন পাঠাবার তিনদিন বাদে আমাকে পোস্ট্যাল পিওন মারফৎ খবর দেওয়া হলো যে চিঠিটা যায়ইনি, আরও দেড়শ টাকা নাকি চার্জ! অবশ্যই তা দিইনি কেননা তার আর তখন প্রয়োজন ছিলনা । ক্রেতা সুরক্ষা কমিটি তে গেলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যেত কিন্তু কত বিনিদ্র রজনী কাটাতে হত কে বলতে পারে! এটাও কর্মবমুখতা, কিন্তু সেটি একটি স্তরে সীমাবদ্ধ ছিলনা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিমুখতা নিম্নতম স্তর থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত বিস্তৃত । ভারতের প্রাচীনতম জগদ্বিখ্যাত একটি কলেজে সিট খালি থেকে যায় অনেক সময় নির্বাচিত ছাত্র ভর্তি হয়না বলে । কিন্তু যে ভর্তি হলনা সে বা তার অভিভাবকরা চিঠি দিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানান প্রয়োজন মনে করেননা, হতে পারে অনিচ্ছাকৃতভাবে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ভাবে । এই খালি সিটটি নিয়ে একটি অর্থকরী ব্যবসা শুরু হয় যার বিস্তার চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে ছাত্রবিভাগের অফিসারের মাধ্যমে ছাত্র বা তার অভিভাবক পর্যন্ত ব্যাপ্ত । বাজারে প্রচারিত হয় কলেজের অধ্যাপক এমনকী অধ্যক্ষ পর্যন্ত ‘টাকা খেয়ে থাকেন’ ।
এগুলি সবই সামাজিক দূষণ, এবং সামাজিক দূষণের শুরু খ্রিস্টজন্মের অনেক আগে । অর্থশাস্ত্রে উৎকোচ গ্রহণকারীর শাস্তি হিসাবে বিধান ছিল হাত কেটে নেওয়া । সেদিন থেকে আমরা অনেক এগিয়ে এসেছি, শুধু কালের হিসাবে নয়, সব দিক থেকে, ব্যক্তিগত সততার অভাব যার মধ্যে একটি । এই সততার অভাব কিন্তু একটি নয়, অসংখ্য । আর সততার অভাব যে সর্বত্র বাড়তি অর্থ উপার্জনের জন্য তাও নয় । আমার পরিচিত ডাকবিভাগের কর্মীটির তো দেওয়ালের আড়ালে বসে থেকে অতিরিক্ত কোনো রোজগারের ঈপ্সা ছিলনা, থাকা সম্ভবও ছিলনা । এটা এক ধরনের আলস্য, পরিণামে কর্মবিমুখতা । সরকারি চাকরিতে, বা সরকারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত চাকরিতে কর্মবিমুখতার কোনো শাস্তি নেই, তাই তা শোধরানোরও কোনো উপায় নেই । বরং ব্যক্তিগত চেষ্টায় তা শোধরাতে গেলে নানান বিপত্তির সম্ভাবনা, এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণসংশয়ের কারণ । এই সামাজিক দূষণগুলির একক কারণ একটি সর্বজনস্বীকৃত নিয়ম যা পৌঁছে গেছে স্বয়ংসিদ্ধের পর্যায়ে, অথচ যা আদৌ সর্বজনস্বীকৃত নয় । কে বলেছে ভাল কাজ পেতে গেলে চাকরি স্থায়ী হওয়া দরকার, তাতে নাকি সংস্থার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে । বরং দেখা যাচ্ছে সংস্থার প্রতি আকর্ষণ বাড়ার বদলে বিকর্ষণই বেড়ে গেছে ।
সামাজিক দূষণের অভিঘাত সম্বন্ধে মানুষ, মানে কোনো কোনো মানুষ বহুকাল ধরে সচেতন এবং তা নানান ভাবে শাসন করবার চেষ্টা করা হয়েছে । স্বজ্ঞাপীঠ উদ্দীপন সকলের হয়না বলেই সমস্যা, আর চিন্তাটা একক প্রক্রিয়া । এই জন্য এককভাবে দেখতে গেলে ব্যক্তি স্বৈরাচারী, আত্মবিজ্ঞানবাদী বা প্রবাহে ভাসমান কুটোর ( চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস স্মরণীয়) মতো । এর মধ্যে প্রথম দুটি পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী । সর্বাধুনিক বিশ্বায়নের হিড়িক স্বৈরাচারকে করে তুলেছে আকাশছোঁয়া । আর সেই হিড়িকে যোগ দিয়েছে অনেক আত্মবিজ্ঞানবাদীও । স্বৈরাচারী আর আত্মবিজ্ঞানবাদী দুজনই দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে যে কথা বলেন সমাজ তাতে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । দুটিরই ইতিবাচক সমাধানের জন্য চাই সৎ, যুক্তিসম্মত চিন্তা যা সুস্পষ্ট বোধের কারণ, সমদর্শিতার প্রতি ন্যায়বদ্ধ, সদিচ্ছার পোষক, সুষ্ঠু ভাববিনিময়ের অনুশীলন এবং যুক্তিসম্মত অনুপূর্বিতা । প্রাকৃতিক পরিবেশে দূষণ নিয়ন্ত্রণের সব প্রচেষ্টা এগিয়ে না যাবার কারণ মানুষের সমাজে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দূষণের ক্রমিক বৃদ্ধি । এক শতক আগে মানুষের চিন্তারাজ্যে দূষণের যা মাত্রা ছিল আজ তা থেকে অনেক বেশি । প্রাকৃতিক পরিবেশে দূষণ বৃদ্ধির ফলে প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে । যদি মানুষের বিবর্তন শুধু প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলত তবে হমো সেপিয়েন্স্ সেপিয়েন্স্ উপপ্রজাতিরও বিলুপ্তি ঘটে যেত এতদিনে । কিন্তু মানুষের বিবর্তন চলছে মানসিক স্তরে । পারমাণবিক অস্ত্রে মানুষের সার্বিক বিনাশ বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিকে ভাবিয়েছে । গত অর্ধ শতকে একক ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ অনেক বেড়েছে । ২০০৮ সালে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ১৪০ কোটি ও মোবাইলের মাধ্যমে ৩৩০ কোটি একক মানুষের মধ্যে ভাববিনিময়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে । বর্তমান যুগের আগে বহু সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও তার মাত্রা স্বভাবতই অনেক কম ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪০-এ হেরোডোটাস তাঁর বর্ণনায় ভারতের কথা বিশেষ বলেননি, অর্থাৎ তাঁর কাছে এদেশের খবর পৌঁছয়নি ।
পূর্ববর্তী কোনো অনুচ্ছেদে আমরা বলেছিলাম মানুষের চিন্তা তার একক চিন্তা, সামগ্রিকভাবে সামজিক চিন্তা হয়না । কিন্তু এই অভূতপূর্ব যোগাযোগের একটি সুফল হল বিষয়ভিত্তিক (thematic) চিন্তার সমবর্তন (polarization) । এই সমবর্তন একটি অনন্য বাস্তব, যা আগে কখনও হয়নি । ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে অধ্যাত্মবাদ হয়না বলে যাঁদের ধারণা তাঁরা ধর্ম বলতে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মই বোঝেন । কিন্তু স্বজ্ঞা থেকে উৎসারিত জ্ঞান বা বুদ্ধিও তো অধি আত্ম, অর্থাৎ আত্মার উপরে তার স্থান । তাকে অধ্যাত্ম বলতে আপত্তি কেন ! এখানে আত্ম আর একক ব্যক্তি সমার্থক । সুতরাং নব্য অধ্যাত্মবাদে সামজিক দূষণ দূর হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা । ভূগোলকীয় উষ্ণায়ন যেমন এককথায় পরিবেশে বিশৃঙ্খলার সার্বিক কারণ, তেমনি সমবর্তিত চিন্তা হতে পারে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক, দু ধরনের পরিবেশেরই সংরক্ষণ এবং উন্নতি সাধনের সম্ভাব্য পথ । চিন্তার সমবর্তনের মধ্য দিয়েই আসতে পারে সামাজিক উপলব্ধি ।
দীপংকর লাহিড়ী
[বাল্যে, সেই যখন বাঙলা পরীক্ষার জন্য শব্দার্থ মুখস্থ করার রেওয়াজ ছিল, চমৎকৃত হয়েছিলাম একটি শব্দে । মহামাংস, যার অর্থ নরমাংস । তেমনি পেলাম মহাশঙ্খ, যার অর্থ মড়ার খুলি আর মানুষের হাড় । সেই হিসাবে মননশীল মানুষের মনন প্রক্রিয়ার সঞ্চালনে তার সমাজের সমধর্মী সদস্যদের যে ক্ষয় ও ক্ষতি, যা অবশ্যই দূষণ, তার কি নাম দেওয়া যেতে পারে ! মনে হল মহাদূষণ । আমার এই অনুভব যদি কোনো বিদগ্ধ পাঠককে বিরক্ত করে তবে বর্তমান লেখক ক্ষমাপ্রার্থী । তেমন পাঠকের কাছে নিবেদন ক্ষমার অধিক মহত্তর ধর্ম আর নেই। ]
উনিশ শতকের মাঝামাঝি প্রকাশিত আঙ্ক্ল্ টম্স্ কেবিন ঘৃণ্য দাস প্রথা সম্বন্ধে প্রকৃত চিত্র শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের প্রদেশগুলিতে নয় আটলান্টিকের অপর পারে সুদূর প্রাচ্যের ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় একই সময়ে কোনো দায়িত্বশীল আমেরিকান নাগরিকের চোখে পড়ে নির্বিচার পশুচারণে কীভাবে মরুভূমি পশ্চিমের রাজ্যগুলি থেকে পূর্বের রাজ্যগুলির দিকে আগ্রাসী প্রভাব বিস্তার করছে । বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসের নজরে আনতে একই সঙ্গে আরও কতকগুলি বিষয়ে চোখ পড়ল । শিল্পবিপ্লবের অবধারিত ফলরূপে গ্রাম থেকে নগরে মানুষের ঢল, সঙ্গে তাদের অপরিচ্ছন্ন জীবনচর্যা, খোলা জায়গার আয়তন হ্রাস, মুক্ত বাতাস ও অমলিন জলের ক্রমবর্ধমান অভাব এসবও হল কংগ্রেসের বিতর্কের বিষয় । ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হল প্রথম জাতীয় উদ্যান ইয়েলোস্টোন । প্রকৃতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের এটিই প্রথম পদক্ষেপ ।
সেই থেকে পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আন্দোলন হলেও তেমন কোনো ঐকান্তিক চেষ্টা চোখে পড়েনা সাধারণ মানুষকে পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন করার, বা পরিবেশের প্রতি তাদের আচরণ শুধরানোর । বেসরকারি সংস্থাগুলি তখমও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি পরিবেশের সমস্যাগুলির প্রতি নিয়মিত লক্ষ্য রাখার বা কেউ তার প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করার অভাবে। পরিবেশ দূষণ নামে অধুনা অতি পরিচিত বাক্যাংশ তখনও আসেনি । কিন্তু অনেকে দেখেছেন যে এক ফোঁটা কালি যেমন শুকনো ব্লটিং পেপারে দ্রুত বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় তেমনি পরিবেশে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা একটি ছোট কেন্দ্রক থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে দেরি হয়না । মহাযুদ্ধ বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শস্যক্ষেত্রের, বনভূমির, জলাভূমির ব্যাপক ক্ষতি আর পাশাপাশি প্রযূক্তিবিদ্যার দ্রুত উন্নতি ঘটে গেল । প্রযুক্তিবিদ্যা এনে দিল ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির দ্রুত পুনরুদ্ধারের সুযোগ, খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও অস্ত্রচিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নতি । জন্মের হার বেড়ে চলা আর ক্রমহ্রাসমান মৃত্যুর হার ১৯৫০ সালে পৃথিবীর ২,৫৫৫,৯৮২,৬১১ জনসংখ্যাকে ২০০০ সালে এনে তুলল ৬,০৮১,০০২,৯৩৭-এ । আর তা বেড়েই চলেছে গুণোত্তর হারে । খাদ্যের বৃদ্ধি তো তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখতে হবে, তাই বেড়ে চলল কীটনাশক আর কৃত্রিম সারের ব্যবহার । শুরুতে বোঝা যায়নি খাদ্যের পুষ্টিগুণ কী হারে কমে যাচ্ছে।
আঙ্ক্ল্ টম্স্ কেবিনের মত মানবমননে এযুগের তীব্র অভিঘাত রাশেল কার্সনের Silent Spring গ্রন্থের ১৯৬২ সালে । উপন্যাসের আঙ্গিকে রচিত এই বইটিতে দেখানো হল কীভাবে প্রাণচঞ্চল বসন্তকাল স্তব্ধ হয়ে গেছে কীটনাশকের ব্যবহারে । সেই উপন্যাসের রঙ্গমঞ্চে বসানো হয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন স্থানের পরিবেশের সমস্যাগুলি, নাটকীয় ভাবে এসেছে একের পর এক অধ্যায়গুলি। নামের নমুনা দিয়ে তার পরিচয় এরকম : A fable for Tomorrow, The Obligation to Endure, Elixir of Death, Surface Waters and Underground Seas .. ইত্যাদি । তার পর দলে দলে এল গ্যারেট হার্ডিনের The Tragedy of the Commons (১৯৬৮), পল এহ্রলিশের The Population Bomb (১৯৬৮), ডোনেলা এইচ মেডোর The Limits to Growth (১৯৭২)। এগুলি সরকারি সংস্থাগুলির প্রতি পরিবেশবিদদের তথাকথিত রহস্য উন্মোচক বা জীবনমূলক সাহিত্যের আহ্বান পরিবেশের ক্ষতিকারক মানুষের ক্রিয়াকলাপের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার । ১৯৭৪ সালে এল রবার্ট হেইলবোর্নারের An Inquiry into the Human Prospect । প্রতিপক্ষও কমজোরি নয়, ১৯৮৪ সালে এল কুলিয়ান সাইমন আর হার্মান কানের The Resourceful Earth । তাঁদের বক্তব্য মানুষের এতই ক্ষমতা যে তারা তাদের সব ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে যথাসময়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে ।
সব গ্রন্থই প্রচুর পাঠক পেল, কতকগুলি আঞ্চলিক ক্লাব আসন্ন পরিবেশীয় সংকট নিয়ে যে প্রচার শুরু করল তা ক্রমশ আন্তর্জাতিক সাড়া জাগাল । তা সত্ত্বেও পাঠ্যক্রমের বাহিরে থেকে গেল অনেকে যাদের কাছে পরিবেশ রয়ে গেল অধরা, কিংবা অজ্ঞেয় । অনেকে তো বুঝে উঠতে পারেননা পরিবেশ বিদ্যা বিজ্ঞান, না দর্শনের একটি কল্পনা বা অনুভূতি মাত্র। কারণ তাঁরা বাল্যকাল থেকে জেনে এসেছেন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শুধু সেই পদ্ধতি যা জ্ঞান আহরণ করে পরিমাপন, পূর্বাভাস আর তা যাচাই করার মাধ্যমে । বা পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও অনুমানের পর্য়ায়ক্রমে । পরিবেশের অনুসন্ধানে কোথায় সেই সব ধাপ, কোথায় পরীক্ষণ, কোথায়ই বা পর্য়বেক্ষণ, অনুমান থাকলেই বা! এর পাশাপাশি আবার এক ধরনের মানুষ ভাবতে শুরু করলেন পরিবেশ একটি প্রাণী, শুধু প্রাণীই নয় তা মননশীলও বটে । তাকে বিপন্ন করলে সেও উচিত শিক্ষা দিতে ছাড়েনা । যত দিন এগোচ্ছে ততই এই সব মানুষ দলে ভারি হচ্ছেন । এঁদের মধ্যে যেমন আছেন সাধারণ মানুষ তেমনি আছেন পরিবেশবিদও । তাঁরা শিখাচ্ছেন কী করে পরিবেশকে ভালবাসতে হয়, আর সেই ভালবাসার প্রতিদান পরিবেশ দেয় কীভাবে । তাঁদের লক্ষ্য মানুষের মনে পরিবেশের অনুরণন। তবু পরিবেশের প্রক্রিয়াগুলিকে মননশীলতার পরিচয় বলে না ভেবে অনেকে ভাবতে চান প্রাকৃতিক বিক্রিয়া হিসাবে । উপলব্ধি কথাটি তাঁদের পক্ষে অনেকটাই গুরুভার ।
ইতিহাস বলে মানুষ কিন্তু চিরকাল পরিবেশ সম্বন্ধে এতটা অচেতন ছিলনা । বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই বহু উচ্চারিত শ্লোক সবাই বহুবার শুনেছেন, । মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ মাধ্বীর্ণঃ সন্ত্বৌষধিঃ ... তার পরে আছে মন্ত্র । ব্রহ্মবিদ্যা শিখব বললেই শিক্ষা শুরু করা যায়না, তার উপযুক্ত সময় আছে, আর সেই অনুকূল সময়ের কথা যত সুন্দরভাবে আছে এদেশে, প্রায় ষাট হাজার বছর আগে পরিবেশ সচেতনতা শুরু হলেও এমনভাবে আর কোথাও নেই । ষাটহাজার বছর আগে আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুরু, ছ’ হাজার খ্রীস্টপূর্বে দক্ষিণ ইস্রায়েলের পতনের কারণ নির্বিচারে বনছেদন, ২৭০০ খ্রিস্টপুর্বে গিলগামেশ মহাকাব্য, ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে মোহেঞ্জোদারো, ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বে মোজেজের অনুশাসন, এসব বিচার করেছেন পিথাগোরাস, পরে হেরোডোটাস, বিচার করেছেন প্রথমটি ছাড়া, এসেছে আচরণ বিধি । তবে অন্তরের অন্তঃকরণে প্রকৃতির ক্রিয়াশীলতার অনুরণন সেই উপলব্ধি । কিন্তু সব পরিবেশবিদই যে সেই উপলব্ধি অনুসারে কাজ করেন তা ভাবার মত যথেষ্ট তথ্য এখনও অনেক দূরে । বরং পরিবেশকে সামনে রেখে আক্রমণাত্মক সক্রিয়তা অনেক বেশি স্পষ্ট ।
মহাবিস্ফোরণে বিশ্ব সৃষ্টির পর আমাদের বর্তমান সেকন্ডের কয়েক সেকন্ড ধরে কাল ছিল অতি দ্রুতগতি, সেখানে কালের মাপ ন্যানো সেকন্ডে, অর্থাৎ একশ’ কোটি ন্যানো সেকন্ড যখন একালের এক সেকন্ডের তুলনীয় । সেই কালে যে কোনো বিন্দুতে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে তাকালে আজকের হিসাবে এক বর্তমান সেকন্ডে যিশুখ্রিস্টের জন্মকালে পৌঁছে যাব আমরা। আমাদের হিসাবে কয়েক সেকন্ডের মধ্যে এসে গেল প্রকৃতি । প্রকৃতি তখন দ্রুত পরিবর্তনশীল, জন্মের অব্যবহিত পরেও চলেছে মৌল সৃষ্টি । সব মৌল এসে পড়ার পর প্রকৃতি প্রথম রূপ পরিগ্রহ করল, এল পরিবেশ । সেই পরিবেশ ভূবিদদের অনুসন্ধানের বিষয় । আমরা তার বাঙলা করেছি প্রতিবেশ । আর মানুষ তার মননশীলতার প্রথম রূপ দিল আগুনের নিয়ন্ত্রণে । সেই আমাদের সামাজিক পরিবেশের শুরু। আর এই শুরুর প্রথম থেকেই এসে পড়ল বৈষম্য, একদল অধিকার পেল আগুনের আর বাকিরা তা পেলনা । যারা পেল তারা উন্নত সেই থেকে, বাকিরা রয়ে গেল অনুন্নত, ক্রমে উন্নতিশীল, কারণ তারাও পাকেপ্রকারে আগ্রহী আগুনের নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি আয়ত্তে আনতে । আজও কি তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেছে ? ঘটেনি । ঘটেনি বলেই সমাজবিদ্যা সামাজিক বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত ।
তাই সমাজের পরিবেশ, যা সমাজবিদদের অনুশীলন, সমীক্ষা, পরীক্ষা, সংশোধনের বিষয়বস্তু, তাকে জানতে হলেও চাই প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্বন্ধে জ্ঞান, কারণ প্রাকৃতিক সব প্রক্রিয়া সমাজের ক্ষেত্রে সমভাবে ক্রিয়াশীল । শুধু মানুষের মনন তার রদবদল করে খনিকটা আয়ত্ত্বাধীন করেছে । অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষই জানেননা যে চেতনাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই মননশীলতা, যা সম্ভবত অন্য প্রাণির নেই, হয়তো প্রাইমেট গণের কিছু কিছু প্রজাতির সীমিত পরিমাণে আছে । আর একটি বিষয় অনেকে জানেন না সম্ভবত যে, পাঠ্যক্রমের শিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা নয় । আমরা যাঁদের সাধারণত অশিক্ষিত ভাবি তাঁরা বিদ্যালয় শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও যে যথেষ্ট শিক্ষিত তার প্রমাণ রেখেছেন তাঁদের বৃত্তিগত কার্যকলাপে । কৃষিকর্ম এরকম একটি বৃত্তি ।
সামাজিক পরিবেশে সবচেয়ে বড় যে শক্তি তা হল জনগণ, কারণ তার ভার ভয়াবহ, কিন্তু তা ভয়প্রদভাবে অজ্ঞ । সে অজ্ঞতা ব্যক্তিগত ভাবে অজ্ঞতা নয়, কারণ প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ । কিন্তু অসুবিধা হল কোনো একটি বিষয় লক্ষ্য হলে তার সমবর্তন (polarization) দরকার, আর এই সমবর্তন করে আমদের বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা । কিন্তু একটি ত্রুটি চোখে পড়ছে প্রথাগত শিক্ষাক্রমে, সেখানে পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতনতার ইতিহাসের কোনো আলোচনা নেই, নেই কোনো বিশ্লেষণ । পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যার মত অনেক বিদ্যায় ইতিহাস যতটা জরুরি তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি কিন্তু পরিবেশবিদ্যায় । কারণ বৈজ্ঞানিক অনুমিতির প্রয়োগে পরীক্ষা, নিরিক্ষণ ও অনুমিতির পর আরও একটি ধাপ আছে, তা হল উপলব্ধি । চিকিৎসাবিদ্যায় চিকিৎসকের সাফল্য আসে না সেই উপলব্ধি না এলে । শুধু চিকিৎসাবিদ্যাই নয়, বিজ্ঞানের সব শাখায় সুপরিচিত গন্ডির বাহিরে পদক্ষেপের জন্য দরকার পরিচিত বিষয়ের ঊপলব্ধি । আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রথম তাঁর কাছে নাকি ধরা পড়ে উপলব্ধির স্ফুলিঙ্গ রূপে, অনেক পরে তা প্রমাণিত হয় । তবে সর্বযুগে কোন কোনো মানুষের সেই উপলব্ধি হয়েছে । অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে আমরা তাঁদের মধ্যে নাম করতে পারি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির, ফান গখের, সোয়েইৎজ়ার, পল থোরো, পল ব্রান্টন, হেমিঙওয়ে, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আরও অনেকের । সমাজের প্রধান বল জনমানসকে সচেতন করতে হলে চাই সেই ইতিহাসের সচেতনতা, আর পরিবেশবিদদের তো তা চাইই, তবে তো সার্বিক সমবর্তন সম্ভব !
সেই আদিযুগে মানুষ যখন সবে গোষ্টীবদ্ধ হতে শুরু করেছে তখনকার পটভূমিতে এই উপলব্ধি ছিল যথেষ্ট । হয়তো আমাদের সেই আদি পূর্বপুরুষরা ভেবেছিলেন যে আর সব গোষ্টীবদ্ধ প্রাণীর মতো মানুষও চালিত হবে তাদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে । কিন্তু এই সহজাত প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নিল যুক্তিসংগত চিন্তাভাবনা, যা থেকে এল চিন্তাধারায় যুক্তি পরম্পরা, এবং তা বিকশিত হল মননে, ইংরেজিতে আমরা যাকে rationality বলি, তাতে । আদিযুগে বর্ধিষ্ণু পরিবার থেকে আয়তন বৃদ্ধির ফলে ক্রমে এল গোষ্ঠী । এইসব জটিল থেকে জটিলতর ঘটনা ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র একসঙ্গে ঘটেনি, ঘটেছে আলাদা আলাদা ভাবে । আগুনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিভাজন শুরু হয়েছিল মনুষ্য মন্ডলে তা সমাজের পরিবর্ধিত আয়তনে নানাভাবে ব্যক্তিদ্বারা বা কোনো দলের দ্বারা অন্যকে বা অন্য দলকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টায় প্রযুক্ত হতে শুরু করল । ঔচিত্য (propriety) ও সমস্যার সুষ্ঠু সম্পাদনের অগ্রাধিকার ছিনিয়ে নিতে এগোলো বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা দল । মানবসমাজের আধুনিক সব সমস্যার শুরু সেই থেকে, অর্থাৎ সমাজে দূষণের সূত্রপাত সেই থেকে । তবে এসম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণের প্রয়াসের আগে আমাদের দেখে নেওয়া দরকার জৈবমন্ডলের বিভিন্ন বাস্তব্যধারার সঙ্গে মানুষের সমাজের সাদৃশ্য কোথায় আর বৈসাদৃশ্য কতটা ।
প্রথমেই আমাদের একটা কথা মনে রাখা দরকার _ জীবজগতে মানুষের জীবরূপে গুরুত্ব । মেরুদন্ডী প্রাণিদের উদাহরণে বলি _ ঘোড়া ইকুয়াস (Equus) গণের একটি প্রজাতি, অন্য প্রজাতিগুলি হল গাধা ও জেব্রা । যদি গৃহপালিত পশুর উদাহরণ নিই, তবে গরু ছাগল, এক জীবপরিবারের সদস্য, কিন্তু তারা আলাদা হয়েছে গণ (genus) পর্যায়ে । মানুষের গণ হোমো (Homo), প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স্, আমরা এযুগের মানুষ বস্তুত একটি উপপ্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স্ সেপিয়েন্স্ । গরুর ক্ষেত্রে ভারতের পবিত্র গাভি, ইংরেজ আমেরিকানরা যার নাম দিয়েছে ব্রাহ্মণ, তা একটি উপপ্রজাতি । প্রকৃতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যে জৈব রাজ্য সেখানে কোনো উপপ্রজাতির জনসংখ্যা কিন্তু মানুষের ধারে কাছে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো পর্বেই তা ছিলওনা। অনেকের মনে হতে পারে ডাইনোসরের কথা, কিন্তু এখানে জেনে রাখা ভাল যে ডাইনোসর কোনো জীববৈজ্ঞানিক নাম নয়, একটি প্রচলিত নাম _ সরীসৃপের বিভিন্ন উপপরিবার (subfamily) এবং গণ-এর নানান প্রজাতির নানান উপপ্রজাতির প্রাণির সমাহার । ভূবৈজ্ঞানিক ইতিহাস বলে ডাইনোসরদের দাপট ছিল প্রায় ১৫ কোটি বছর । কিন্তু এককভাবে কোনো প্রজাতির মেয়াদ ৫০ লক্ষ বছর ছিল কিনা সন্দেহ । সেক্ষেত্রে মানুষের উপপ্রজাতি ২ থেকে ২.৫ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তনের পথে সার্বিকভাবে সমানে এগিয়ে চলেছে, অষ্টাদশ শতকে ১০০ কোটি থেকে ২০০৮ সালের এপ্রিলে তার জনসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬৬৭ কোটি ।
দ্বিতীয়ত, সব প্রজাতির বিলুপ্তি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, বিলুপ্তি না হলে নূতন প্রজাতি আসত না । মানুষ তার অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক ক্ষমতা মননের অনুশীলন পরিশীলনে ক্রমান্বয়ে উন্নত হয়ে তার অবধারিত বিলুপ্তিকে প্রতিহত করেছে । কিন্তু এই বাস্তব সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিপন্ন হয়েছে শুধু জৈব বৈচিত্র্য নয়, অজৈব প্রকৃতিও । তা কেন এবং কীভাবে ঘটছে তা বিচার করতে নেমেছেন সমাজবিদ্যার গবেষকরা । তা করতে গিয়ে তাঁরা বিস্মিত হয়ে দেখছেন যে আমরা কখনও আমদের সার্বিক সামাজিক শৈলির মূল বিষয়গুলি সম্বন্ধে অবহিত নই, বরং আমরা যা পড়ি আর শুনি তা ব্যক্তিবিশেষের চিন্তা ভাবনা । সেখানেও যে শুনছে বা পড়ছে তার মানসিকতা দিয়ে তার চিত্র গড়ে উঠছে ।
প্রসঙ্গত ভাষা আর স্মৃতির কথা আসে । ভাষা না থাকলে স্মৃতি কতদূর আসত সেসম্বন্ধে মনোবিজ্ঞানীদের নানান জনের নানা মত । ভাষার সূত্র ধরে ঘটনার পারম্পর্য মনে গ্রথিত হয় নেক্টা গ্রামোফোনের রেকর্ডের মতো । তাকে উদ্দীপন করলে তবে সে স্মৃতি জাগ্রত হয় । যদিও শুধু ভাষা নয় । চিত্রশিল্পী আকৃতিকে মনে ধরে রাখতে পারেন, ক্যামেরার মত সর্বদা তাঁর দৃষ্টি মডেলের প্রতি নিবদ্ধ থাকেনা । সুরশিল্পীরা তাঁর স্মৃতিতে সুর ধরে রাখতে পারেন বলেই দরকারে তা জাগ্রত করে নিজেও সুরসৃষ্টি করতে পারেন । চিত্রকল্প বা সুর ধরে রাখার ক্ষমতা সবার সমান নয় । অর্থাৎ স্মৃতিশক্তি সবার সমান প্রখর নয় । স্বজ্ঞার প্রধান ধারক স্মৃতি, তাই যার স্মৃতিশক্তি প্রখর তার স্বজ্ঞাও উন্নত । উন্নত স্বজ্ঞা হলে চিন্তা স্বচ্ছ হয় । সুতরাং শোনা বা পড়ার মাধ্যমে যে তথ্য আহৃত হয় তা কতটা ইতিবাচক আর কতটা নেতিবাচক, কতটা বিশ্বাসযোগ্য আর কতটা বিভ্রান্তিকর তা বিচার করার ক্ষমতা জন্মায় । ব্যক্তিবিশেষে এই ক্ষমতার তারতম্য অনেক বলে সমাজের সাধারণ বুদ্ধি সবসময় ইতিবাচক উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটায় না । বস্তুত সমাজের সাধারণ বুদ্ধি বলে কিছু নেই ।
বহু ব্যক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক সিদ্ধান্তে গঠিত হয় সমাজের মূল উদ্দেশ্য । যদি শুধু দুটি কি চারটি মানুষ কোনো কথা বিশ্বাস করে তবে তার কোনো প্রতিঘাত ঘটেনা, তেমনি একটি গ্রন্থে কিছু ছাপা হয়ে যদি ব্যাপকভাবে পঠিত না হয় তবে সমাজের বক্তব্যরূপে তার কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটেনা । কিন্তু কোনো বক্তব্য যদি বারবার প্রচারিত হয় তবে তা একটি সত্য হয়ে দাঁড়ায়, যদিও সে সত্যের নিরপেক্ষ প্রকৃতিতে বাস্তবতা নাও থাকতে পারে । অথচ সমাজে তা যুক্তিসিদ্ধ বলে গৃহীত হতে পারে । অর্থাৎ কোনো যুক্তিসিদ্ধ সিদ্ধান্ত ১০০% প্রকৃত সত্য নয় । মানব সমাজের সমবায় মননে দূষণ অনুপ্রবেশের এটা একটি ফাঁক । দূষণ ইচ্ছাকৃত হতে পারে, আবার ভুল করেও হতে পারে । চলনে বলনে আমরা অনেকটা আমাদের মননশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কথোপকথনে কিছু নেতিবাচক বিষয় ঢুকে পড়ে । টিমথি গার্টন অ্যাশ এই ভ্রান্তির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন ‘The difference was not, to be sure, between the pure white of a completely free press and the solid black of a wholly unfree one, but between the light gray of the largely free and the dark gray of the largely unfree. In East Germany, that gray was pretty dark.’
সব ব্যক্তমানবের মানসে এমন কী, প্রজন্ম্বের মানসে কতকগুলি স্বতঃসিদ্ধ মত আছে । তার কিছু কিছু মনের অচেতন বা অবচেতন ধারণা যা প্রজন্মের পরম্পরায় বাহিত হয়ে চলেছে, সাধারণ মানুষ (অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ নন এমন মানুষ) তা কোনোদিন বিচার করার কথা ভাবেননি । যেমন সাধারণ বিশ্বাস যে সব পথ্যে উপযুক্ত পরিমাণে ভিটামিন আছে । ভিটামিন সেক্ষেত্রে একটি অনির্দেশ্য সত্ত্বা । যিনি বলছেন আর যিনি শুনছেন তাঁরা জানেননা ভিটামিন কত রকম হয়, এবং সুস্থ শরীরে তার কোনোটি বিপজ্জনক কিনা। কলকাতার বনেদী মধ্যবিত্তদের (যাদের মধ্য থেকে একদা বেরিয়েছিলেন বুদ্ধিজীবিরা) দেখেছি অনেকের ধারণা প্রোটিন আর মাংসল দেহ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত । তাঁদের ধারণাই নেই বহু রোগের কারক বিশেষ বিশেষ প্রোটিন । মননে দূষণের কারণ এমন অনেক দৃঢ়মূল ধারণা যার প্রচারে সংবাদপত্রের বিজ্ঞানবিষয়ক রচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেগুলি লেখক দায়সারাভাবে লেখেন । ভ্রান্ত বা অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে এইসব দূষণ কিন্তু প্রকৃত দূষণ, তার অপকার করার ক্ষমতা কিন্তু উদ্দেশ্য প্রণোদিত দূষণের সমান ।
মননভিত্তিক জীবনচর্যার মধ্যে ইতিবাচক আর নেতিবাচক দু ধরনের উপাদানই থাকে, ফলে সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সব সংস্থাগুলিতে সদস্যদের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক । নেতিবাচক উপাদানটি সরিয়ে নিতে পারলে দ্বন্দ্ব ঘুচে যায় । যাঁরা রাজনীতি করেন অনেকসময় তাঁরা সচেতনভাবে দ্বন্দ্বটি বজায় রাখেন, কারণ তাহলে সেই বিশেষ সিদ্ধান্তে মতৈক্যে পৌঁছন যায়, যা তাঁরা চাননা । যে কোনো সামাজিক বিষয়, যেমন সংরক্ষণ, এরকম একটি বিষয় (theme) । অনন্তকাল ধরে বিশেষ কতকগুলি শ্রেণীর জন্য কতকগুলি সামাজিক সুযোগ সুবিধার সংরক্ষণ সেই শ্রেণীগুলিকে সমৃদ্ধ করে কিনা তা বিতর্কের বিষয় । এই বিষয়ের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই উপাদানই আছে। যুদ্ধের পর বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক । দেশবিভাগের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েক বছর তার দরজা খুলে রেখেছিল উদ্বাস্তু ছাত্রদের জন্য । কিন্তু তা নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াত যদি তা আরও সাত দশক খোলা থাকত । নেতিবাচক বিষয় নিজে দূষণকারী হয়ে আরও পাঁচরকম দূষণের পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারে, যেমন জৈব মন্ডলে একটি দূষক বহুমুখী দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ব্যক্তিগত উপাদানরূপে নেতিবাচক যুক্তি ক্রমে সমবায়িত হতে হতে সমাজের মননের গভীরে শিকড় বিস্তার করে সমগ্র সমাজের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। এমন সময়ও আসতে পারে যখন যুক্তিবান মানুষও ধন্ধে পড়ে যান সত্যকে সত্য রূপে চিনে নিতে । বিভিন্ন শ্রেণীর এজাতীয় উপাদান পরিণামে সমাজের অবনতি ঘটায় । এই নেতিবাচক উপাদানগুলির প্রচলিত নাম সংস্কার, যা প্রায় সর্বদা নেতিবাচক উপাদান বুঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘কুসংস্কার’ কথাটি দিয়ে । অথচ সংস্কার কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘সু’ অর্থাৎ ইতিবাচক দিকটি । অবশ্য বিতর্কের খাতিরে অনেকে বলতে পারেন সম্যকভাবে করা যে কোনো ক্রিয়াই তো সংস্কার ! তা মানুষ কি সম্যকভাবে হত্যা করতে পারেনা ? অবশ্যই পারে । মানুষ মারাটা প্রথা হলে তাকে সংস্কার বলে মানতেই হয়, যেমন এককালে নরবলি সংস্কার ছিল । তবু দেখা যাচ্ছে বহুব্যবহারে অনেক ইতিবাচক শব্দ নেতিবাচক হয়ে গেছে । মহাজন এরকম একটি শব্দ ।
জীবজগতে অগ্রগতিকে বলে বিবর্তন, কিন্তু মানবসমাজে অগ্রগতিকে বলে উন্নতি । কিন্তু এই উন্নতি সামগ্রিক নয়, এককভাবে অনেক ব্যক্তির উন্নতির সামগ্রিক (integrated) রূপ মাত্র । কারণ চিন্তা মানুষের একক প্রক্রিয়া, সামাজিকভাবে কোনো চিন্তাপ্রক্রিয়া হয়না, তা হওয়া সম্ভবও নয় । এযুগে চিন্তাহীন সামাজিক ক্রিয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ধর্মোন্মাদনায় সম্পাদিত ক্রিয়া । সে ধর্ম শৈব, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্ম যেমন হতে পারে তেমনি কোনো রাজনৈতিক মতবাদও হতে পারে । চিত্রশিল্পে শৈলী সম্বন্ধে মতের প্রভেদের চূড়ান্ত পরিণতি গ্যগাঁর সঙ্গে ফান গখের কলহ, যার বর্ণনা আছে Lust for Life গ্রন্থে । ভারতের সনাতন ধর্ম ছাড়া আর সব ধর্মই কোনো না কোনো ধর্মগুরুর দ্বারা প্রচারিত । ভারতের সনাতন ধর্ম বলতে অনেকের মনে হতে পারে হিন্দুধর্ম, কিন্তু হিন্দু তো পারসিকদের দেওয়া নাম । ব্রাহ্মণ্য, শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, তার কোনটি তথাকথিত হিন্দুধর্ম নয়? কারণ সব কিছুরই উৎপত্তি তো সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্বমীমাংসায় । চার্বাকপন্থী সত্যকামের বশিষ্ঠ পরিচয় দিয়েছিলেন নাস্তিক ব্রহ্মর্ষি বলে । যা লক্ষ্যণীয় তা হল, শুধু ভারতীয় ধর্মই নয়, খ্রিস্ট ধর্ম, ইহুদিদের জুডাইজম, ইসলাম, বাহাই, সব ধর্মেই ব্রহ্ম এক এবং অনুপম । শিন্টোইজম, কনফুসীয় ধর্ম এবং জৈনধর্ম ব্রহ্ম সম্বন্ধে বিশেষ কোনো ধারণা পোষণ করেনা, তাদের উদ্দেশ্য জীবনচর্যায় বিশেষ কতকগুলি আচার পালন ।
স্বজ্ঞা (intuiton) এই প্রসঙ্গে আর একটি বহুব্যবহৃত শব্দ । স্বজ্ঞা কোনো প্রবৃত্তি (instinct) নয়, কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া (conditioned reflex) নয়, কোনো শারীরিক ক্রিয়া নয় । তা বৌদ্ধিক, অন্যগুলি শারীরিক ক্রিয়া । স্বজ্ঞার সংজ্ঞা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে ভারতের বৈশেষিক দর্শনে, তবে তা এখানে সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয় । ইয়োরোপীয় দার্শনিকদের বিশ্লেষণ যথেষ্ট জটিল হলেও তাঁদের অনেকে অভ্যাসের পিছনে স্বজ্ঞার ভূমিকার কথা বলেছেন । এই অভ্যাস আবার ধর্মীয় আচারের উৎস হতে পারে। আচার যদি নেতিবাচক, এক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক হয় তবে তা হয়ে দাঁড়ায় দূষণ । স্বজ্ঞার একটি পীঠ আছে, তা হল ব্যক্তিসত্ত্বার মগ্নচৈতন্য । শারদ প্রভাতে রবিকিরণের স্বর্ণাভা, সাগরসৈকতে সাগরের নীলিমায় মনের উল্লাস, ঘনবনানীর সর্বব্যাপী ঝিল্লিরবের অভিঘাত কিংবা সূচীভেদ্য নীরবতার অস্বস্তি এগুলির কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা যায়না, কিন্তু মন প্রাণ দেহ দিয়ে অনুভব করা যায় । তবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এই অনুভূতির মাত্রা আলাদা । কারও বেলায় তা অভিভূত করে, কারও বেলায় তা শুধু ছুঁয়ে যায় । স্বজ্ঞার সুবিস্তীর্ণ এলাকায় সর্ববিধ আবেগ বা ভাবের সঙ্গে যুক্ত মানসিক ক্রিয়ার গতিবিধি, সেখানে মননের বস্তু নিরপেক্ষ বিচার প্রশমিত । তাই এসব বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে তারতম্য ঘটে থাকে । এজন্য মানবসমাজে একটি পারিসাংখ্যিক প্রক্রিয়ায় কোনো শিল্পনিদর্শন, কোনো সঙ্গীত ইতাদি সম্বন্ধে চূড়ান্ত মতামতের সমবর্তন ( polarization) ঘটে । ফলে মানুষের মনোরাজ্যে নানারকম বিভাজন ঘটে থাকে। আগুনের নিয়ন্ত্রণ আবিষ্কারের পর যেমন হয়েছিল তেমনি উন্নতমনস্ক ও ভিন্ন ভিন্ন মানের উন্নতিকামী মানুষের বিকাশ ঘটে । পাড়ার দুর্গোৎসব থেকে শুরু করে বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, শিল্পী সম্মেলন, সঙ্গীত সম্মেলন ইত্যাদিতে একটি পাইয়ে দেওয়া ও বাধিত হওয়ার কূটসম্পর্ক গড়ে ওঠে । আধুনিক সভ্যতায় এটি কূটনীতি নিয়ন্ত্রিত দূষণের সর্বপ্রধান ক্ষেত্র, আঞ্চলিক পরিসীমা থেকে প্রাদেশিক, রাষ্ট্রীয় এবং সব শেষে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত যার ব্যাপ্তি । বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন পুরস্কার তার একটি অতিপরিচিত নিদর্শন । অনেকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সম্মান নোবেলকেও সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন ।
তবু সাধারণ অভিধানে স্বজ্ঞার অর্থ নির্দেশ করে মগ্নচৈতন্য বা অবচেতন বলে । যেন মগ্নচৈতন্য আর অবচেতন সমার্থক । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয় । এসব ক্ষেত্রে বোঝা যায় শব্দের মাধ্যমে সব কিছু বোঝানো যায়না, কোনো জিনিষ বুঝতে গেলে চাই চৈতন্যের আর একটি স্তর, যার অর্থবোধক কাছাকাছি শব্দ উপলব্ধি । ভারতীয় দর্শনের একটি হল যোগশাস্ত্র । এই শাস্ত্রে বিস্তারিত নির্দেশ আছে কীভাবে মগ্নচৈতন্যকে উদ্দীপিত করা যায় । মগ্নচৈতন্য উদ্দীপিত হলে ব্যক্তি চৈতন্যের সঞ্চার ঘটাবার ক্ষমতা অর্জন করে । যোগশাস্ত্রের প্রক্রিয়া রীতিবদ্ধ প্রক্রিয়া । কিন্তু সেই পথে না গিয়েও মগ্নচৈতন্য উদ্দীপন যে সম্ভব তার প্রমাণও আছে । ছয় শতাব্দীর প্রাচীন টমাস কেম্পিসের গ্রন্থ Imitation of Christ মগ্নচৈতন্য উদ্দীপনে খ্রিস্টানরা ব্যবহার করে আসছেন । তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার অনুশীলনে এভাবে উদ্দীপিত মগ্নচৈতন্যের উদ্ভাসে উদ্ভাসিত জার্মান ফন বাইৎস্যাকারের History of Nature, মগ্নচৈতন্য কতটা উদ্ভাসিত হলে এরকম বই লেখা সম্ভব তা বিচার করতে গেলেও দরকার এমন পাঠকের যাঁর চৈতন্য অনেকটা এগিয়ে । কিন্তু যাদের চৈতন্য অবচেতনের খাঁচায় আবদ্ধ, History of Nature-এর একটি অনুচ্ছেদও তার বোধের বাহিরে । চিত্রশিল্পীদের মধ্যে ফান গখ, ল্যত্রেক, গ্যগাঁর নাম করা যায় যাঁরা তাঁদের মগ্নচৈতন্যকে সঞ্চারিত করতে পারতেন । তবে স্বজ্ঞার পীঠ (পতঞ্জল যার স্থান নির্দেশ করেছেন হৃদয়ে অনাহত চক্ররূপে) সম্পূর্ণ উদ্দীপিত না হলেও চিন্তা করতে গেলে স্বজ্ঞা খনিকটা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বুদ্ধিলব্ধ ধারণাগুলি সুসংবদ্ধ করতে । ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে পরিস্রুত হয়ে স্বজ্ঞাপীঠে সঞ্চিত হবার আগে একটি পারিসাংখ্যিক প্রক্রিয়ায় আমাদের মনোরাজ্যে অভিজ্ঞতা হয়ে জমা হয়, এই অভিজ্ঞতাসিঞ্চিত বুদ্ধিকে বলে প্রজ্ঞা । প্রসঙ্গত কিন্তু সঙ্গোপনে বলি শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এরকম একটি গ্রন্থ যা Imitation of Christ-এর মতো স্বজ্ঞাপীঠ উদ্দীপনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহু শতাব্দী ধরে শুধু ভারতে নয় বিদেশেও ।
স্বজ্ঞাপীঠেই উপলব্ধির বিকাশ। স্বজ্ঞাপীঠ সম্পূর্ণ উদ্দীপিত না হলেও প্রজ্ঞা বা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাহিরের যা কিছু তার যেটুকু সার সেখানে সঞ্চারিত হয় তাতে কোনো ঘটনা বা বস্তুর মধ্যে বেমানান কিছু থাকলে তা অনুভূত হয় বা চোখে পড়ে । বাক্যালাপে বা কোনো ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণে বেখাপ্পা কিছু থাকলে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি তা শুধরে নেবার চেষ্টা করেন । এভাবে কথাবার্তা পোশাকআশাকে শৈলীর উৎপত্তি হয় । চিন্তাধারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও দুটি ব্যক্তির মধ্যে চিন্তার সাযুজ্য শৈলীর অন্যতম অবদান । বহু একক ব্যক্তির চিন্তাধারা একই শৈলী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে সামজিক শৈলীর বিকাশ ঘটে । দুটি আলাদা সমাজ, আমরা বলতে পারি জাতি (nation), তাদের মধ্যে সামাজিক শৈলীর পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা বেশি । শৈলীর সঙ্গতি দিয়ে জাতি চিহ্ণিত বলে জাতির আবির্ভাবের জন্য চাই একটি ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে নির্দিষ্ট ভূখন্ড । ভূখন্ড কৃত্রিম ভাবে বিভাজিত হলেও শৈলীর সম্পূর্ণ বিভাজন ঘটে দুটি সুনির্দিষ্ট জাতির আত্মপ্রকাশ সহজে হয়না । আগে যদিও তা দুচার প্রজন্মের মধ্যে সম্ভব হত, এযুগে ইন্টারনেট ও মোবাইলের সংযোগসূত্রের জোরে পুরানো শৈলী সুদীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকার সম্ভাবনা ।
অবশ্য মগ্নচৈতন্য মাত্রই স্বজ্ঞা নয়, তার মধ্যে অবচেতনও আছে । এই অবচেতনে বাল্যকালে দূষণ জমে থাকতে পারে যা বিভিন্ন মানসিক রোগের কারণ হয়ে পরিণত জীবনে ব্যক্তিবিশেষকে, তার পারিবারিক জীবনকে, ক্ষেত্রবিশেষে তার চারপাশের মানবিক পরিবেশকে বিব্রত করতে পারে । এইসব মানুষ ছিটগ্রস্ত, বাতিকগ্রস্ত ইত্যাদি নামে চিহ্নিত হন । এরকম ঘাটতির গভীরতা কিন্তু বিরাট । প্রবন্ধের এই জায়গাটি লিখতে গিয়ে আমার প্রবন্ধের শিরোনামের কথা মনে হচ্ছে । প্রকৃতির কাছ থেকে আমাদের আদিম পুরুষ হয়তো পেয়েছিলেন মনন, কিন্তু তার যাদুস্পর্শে অনন্তে বিস্তারলাভ করে মননের রাজ্য হয়ে উঠেছে মহা । ফলে মানুষের কাজকর্ম ভাবনাচিন্তা সব কিছুই অনন্তে বিস্তারলাভের জন্য উন্মুখ । অবচেতন মনের ক্ষেত্রও অনন্ত, তাই সেখানে ঘাটতির প্রকৃতিও অসংখ্য ধরনের । মনোরোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা একটা বয়স পর্যন্ত counselling করে থাকেন, কিন্তু সেই বয়সের ঊর্ধ্বতম সীমা খুবই কম । একটু বেশি বয়সে, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর counselling কতটা সার্থক সে সম্বন্ধে নিজেরা সন্দিহান বলে তা না করে flunil জাতীয় কিছু ওষুধ ব্যবহার করেন যা রোগীর রোগ নির্মূল করেনা । L. Ron Hubbard এই রোগ সারাবার জন্য যে পদ্ধতি চালু করেন তা Scientology নামে পরিচিত । এই পদ্ধতি অবচেতনকে মোছা স্লেটের মতো পরিষ্কার করে দিতে পারে এটাও পরীক্ষিত সত্য । কিন্তু এই সত্যকে অবলম্বন করে দূষণ ঢুকে পড়ল মানব সমাজে । মুছে দেওয়া স্লেটে নূতন অভিঘাত কতটা ভয়ানক হতে পারে তার উদাহরণ হিসাবে অনেক মনোবিদ হিটলার ও স্ত্যালিনের নাম করেন । ব্যক্তিবিশেষ তার রাজনৈতিক ও পুঞ্জত শারীরিক শক্তি দিয়ে বলতে পারে ‘আমিই একমাত্র সত্য, বাকিসব মিথ্যা’ । এদেশেও তার উদাহরণ মিলবে । বর্তমানে Scientology একটি ধর্ম, ক্যালিফোর্নিয়ায় Church of Scientology International আছে এবং পৃথিবীর সর্বত্র, কলকাতায় শুদ্ধ তার শাখা আছে । কিন্তু বহু দেশে তা আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ এই বিদ্যার মাধ্যমে মনোরোগীর মগজ ধোলাই করে তাকে সমাজবিদ্বেষী কাজে লাগান হয়েছে ।
এই প্রসঙ্গে আক্কেল বা কান্ডজ্ঞানের কথা এসে পড়ে । কান্ডজ্ঞান অর্থ বিচক্ষণতা, যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় প্রতি পদক্ষেপে যুক্তিসিদ্ধ চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে । আমদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে বিচক্ষণতা কাজে লাগে, অভিজ্ঞতা সেই বিচক্ষণতাকে পরিশীলিত করে । স্বভাবতই প্রজ্ঞাবান মানুষের বিচক্ষণতা বেশি । অর্থাৎ বিচক্ষণতা একটি ইতিবাচক গুণ । ভাল খারাপ, পাপ পুণ্য এগুলি বিচক্ষণতা দিয়ে নির্ধারিত হয় । বিচক্ষণতার সঙ্গে অভিজ্ঞতা যোগ করে আমরা কোনো সমস্যা বুঝতে অনেকটা এগোতে পারি । বিচক্ষণতা নিরপেক্ষ, প্রবণতাহীন, দায়বদ্ধ এবং নাগরিক সমস্যা সংক্রান্ত । ইংরেজি ও বাঙলা বহু প্রবচন বিচক্ষণতা সম্ভূত, A stitch in time saves nine, a rolling stone gathers no moss, এক মাঘে শীত পালায়না, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয় কংবা অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী । কিন্তু প্রশাসনের এবং বিভিন্ন সংস্থার পরিচালকদের কান্ডজ্ঞান অবলম্বন করে দূষণ ঢুকে পড়েছে বহু দেশে । সেখানে কান্ডজ্ঞানের অভাব যেমন বিপত্তি ঘটায় তেমনি ঘটায় ইচ্ছাকৃত অভাব প্রদর্শন । তবে এই প্রসঙ্গে আসার আগে আমরা আর একটি কথায় আসি ।
সততা কথাটি স্বভাবতই আসে কান্ডজ্ঞান প্রসঙ্গে । আমরা এটা বুঝি যে সততা আমাদের মনন সম্বন্ধীয় সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় । কারও যদি এই সম্পূর্ণতা থাকে তবে আমরা তার কোনো কথা বা পরামর্শ মান্য করি । সততা আমাদের ইতিবাচক চিন্তাকে নেতিবাচক ভাবনা থেকে ছেঁকে তোলে, কোন কাজ অনস্বীকার্য তা বুঝতে সাহায্য করে এবং সন্তুষ্টি এনে দেয় । তাই আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে সৎ হবার, সৎ কাজ করার, সৎচিন্তা করার আকাঙ্খা থাকে । অন্যভাবে দেখলে আমাদের অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হওয়ার, প্রবঞ্চনাকে প্রতিরোধ করার, ভন্ডামি পরিত্যাগ করার এবং ধান্দাবাজি পরিত্যাগ করার জন্য সততার প্রতি আকর্ষণ । সাধারণত আমরা নিজেরা যেমন সৎ হতে চাই তেমনি যাদের সঙ্গে আমাদের চলাফেরা ও সামাজিক আদানপ্রদান, তাদের মধ্যেও সততা আশা করি । জনসাধারণের বৃহত্তম অংশই চায় এক সৎ জাগতিক পরিবেশ । যদিও সব স্বাভাবিক মানুষ সাধারণ অবস্থায় চায় সত্য কথা বলতে সত্য কথা শুনতে, তবু সমাজে সততার যথেষ্ট অনুশীলন হয়না । পূর্ব সংস্কার, অহমিকা, অবিশ্বাস, ভীতি, ঠকানোর লোভ প্রায়শ আমাদের স্পষ্ট কথা বলার আগ্রহ দমিত করে । সমাজের যুক্তিসিদ্ধ শৈলীর বিকৃতি থেকে আমাদের ব্যক্তিগত সততার গভীর এবং সুদুরপ্রসারী অবনমন ঘটে । সততা আর কান্ডজ্ঞান একটি অপরটির প্রতিরূপ। সততার মূল্য শিখতে কান্ডজ্ঞান দরকার, আবার কান্ডজ্ঞান না থাকলে সৎ হওয়া যায়না । তবে কান্ডজ্ঞান আর সততা ঠিক এক বা সমার্থক নয় । কান্ডজ্ঞান হল একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, আর সততা হল কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করার ঝোঁক । সুস্থ উন্নতিশীল সমাজে সবরকম আদানপ্রদানে এই দুটিই দরকার কারণ এদুটি পরস্পরে প্রতি সেই বিশ্বাস বা আস্থা তৈরি করে যার অভাবে উন্নতি ও সমাজের স্বাস্থ্যের বিঘ্ন ঘটে । তবে সততা কিন্তু বোকামি নয়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় কিছু ব্যক্তির চেষ্টা সৎ ব্যক্তির সততার সুযোগ নিয়ে স্বার্থ রক্ষা করা বা কায়েম করা, যারা আর সবাইকে বোকা ভেবে নিয়ে এগোয়। কিছুকাল, পাঁচ, দশ, পনের বছর এভাবে মানুষকে বোকা বানানো গেলেও পরিণামে তা অতিচালাক ব্যক্তিদের বিনাশের কারণ হয় ।
সততার প্রসঙ্গে সত্য কথাটি এসে পড়ে, যার উলটো দিকে মিথ্যা । এই মিথ্যা নানাভাবে সত্যকে কলূষিত করে । সত্যকে গুলিয়ে দিয়ে বুদ্ধিমান মানুষকেও বোকা বানাবার মতো নানারকম কূটভাষের কথা আমরা শুনি যার একটি বহুল প্রচলিত জেনোর (? খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০) উক্তি, ইংরেজি অনুবাদে যা দাঁড়ায় : All Cretans are liars. I am a Cretan. Therefore I am lying. But if I am lying, then I am not a Cretan, and I might be telling the truth. But if I am telling the truth I must be lying । এই উক্তির বহু রকমফের প্রচলিত আছে আড়াই হাজার বছর ধরে । সংস্কৃত ভাষায় উদ্ভট শ্লোকের মধ্যে এজাতীয় অনেক উক্তি আছে । এ ধরনের উক্তি বিভ্রান্তি ঘটায় । কিন্তু তা সত্ত্বেও সেগুলিকে মিথ্যার সঙ্গে সমীকরণ করা যায়না ।
ব্রিটিশ সরকার শিক্ষকদের বিশ্রী রকম স্বল্প বেতনক্রম ধার্য করেছিল, এতই স্বল্প যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে বা পরে, এমনকী স্বাধীনতার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত স্কুল, কলেজে উপযুক্ত যোগ্যতার শিক্ষকের অভাব ছিল । যাঁরা যোগ্য ছিলেন তাঁদের অনেকে আয় বাড়াবার জন্য প্রাইভেট টিউশানের চক্র সৃষ্টি করেন যা কালক্রমে দুষ্টচক্রে পরিবর্ধিত হয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে সঙ্কট আনে তার আর নতুন করে বর্ণনা দেবার দরকার নেই । দেখাদেখি অনেক চাকুরিজীবী অনুরূপ বাড়তি অর্থপার্জনের জন্য নানান উপায় অবলম্বন করেন । সততার যে অভাব সৃষ্টি করে গিয়েছিল ব্রিটিশরা তার আগাছা ষাট বছরের চেয়ে বেশি প্রাচীন স্বাধীনতায় তা পালামৌ-এর জঙ্গলকেও ছাড়িয়ে গেছে । দক্ষিণ কলকাতার একটি হেড পোস্ট অফিস খোলে সকাল আটটায় খাম পোস্টকার্ড বিক্রির জন্য আর স্পিড পোস্ট নেবার জন্য । প্রতিবারই চোখে পড়েছে কাউন্টারে কেউ নেই । অনেকবার ডাকাডাকির পর কর্মীটিকে পাওয়া গেলেও আমার আগে কোনো লোক না থাকা সত্ত্বেও সময় লাগে অন্তত দশ মিনিট। বেশ ক-বার এই অভিজ্ঞতার পর উপরমহলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর বোধহয় কিছু নির্দেশ এলে সকাল আটটা থেকে কাউন্টারে কারও উপস্থিতি সুনিশ্চিত করা হ্য় । আমার শেষ ওখানে যাওয়া এই ঘটনার পর । সেখানে গিয়ে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল । কর্মীটি কাউন্টারের পাশে দেওয়ালে সঙ্গে ঘেঁসে চেয়ারে বসে আছে, বাহির থেকে চোখে পড়েনা । আমার ডাকাডাকিতে তার কোনো সহকর্মী তাকে সক্রিয় করল । সে তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল আমি কী চাই । উৎকোচ গ্রহণের কথা সবাই জানেন, কিন্তু এটি তো সেরকম কোনো ক্ষেত্র নয়! ডাকবিভাগের নানান দিকে এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবার সময় আমাদের এদিককার টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার কারণে একটি চিঠি স্পিড পোস্টে পাঠাতে হয় । খরচ পড়ে দেড়শ টাকা । রশিদ নিয়ে যখন নিশ্চিন্তভাবে বসে আছি যে চিঠিটা নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে, তখন পাঠাবার তিনদিন বাদে আমাকে পোস্ট্যাল পিওন মারফৎ খবর দেওয়া হলো যে চিঠিটা যায়ইনি, আরও দেড়শ টাকা নাকি চার্জ! অবশ্যই তা দিইনি কেননা তার আর তখন প্রয়োজন ছিলনা । ক্রেতা সুরক্ষা কমিটি তে গেলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যেত কিন্তু কত বিনিদ্র রজনী কাটাতে হত কে বলতে পারে! এটাও কর্মবমুখতা, কিন্তু সেটি একটি স্তরে সীমাবদ্ধ ছিলনা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিমুখতা নিম্নতম স্তর থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত বিস্তৃত । ভারতের প্রাচীনতম জগদ্বিখ্যাত একটি কলেজে সিট খালি থেকে যায় অনেক সময় নির্বাচিত ছাত্র ভর্তি হয়না বলে । কিন্তু যে ভর্তি হলনা সে বা তার অভিভাবকরা চিঠি দিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানান প্রয়োজন মনে করেননা, হতে পারে অনিচ্ছাকৃতভাবে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ভাবে । এই খালি সিটটি নিয়ে একটি অর্থকরী ব্যবসা শুরু হয় যার বিস্তার চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে ছাত্রবিভাগের অফিসারের মাধ্যমে ছাত্র বা তার অভিভাবক পর্যন্ত ব্যাপ্ত । বাজারে প্রচারিত হয় কলেজের অধ্যাপক এমনকী অধ্যক্ষ পর্যন্ত ‘টাকা খেয়ে থাকেন’ ।
এগুলি সবই সামাজিক দূষণ, এবং সামাজিক দূষণের শুরু খ্রিস্টজন্মের অনেক আগে । অর্থশাস্ত্রে উৎকোচ গ্রহণকারীর শাস্তি হিসাবে বিধান ছিল হাত কেটে নেওয়া । সেদিন থেকে আমরা অনেক এগিয়ে এসেছি, শুধু কালের হিসাবে নয়, সব দিক থেকে, ব্যক্তিগত সততার অভাব যার মধ্যে একটি । এই সততার অভাব কিন্তু একটি নয়, অসংখ্য । আর সততার অভাব যে সর্বত্র বাড়তি অর্থ উপার্জনের জন্য তাও নয় । আমার পরিচিত ডাকবিভাগের কর্মীটির তো দেওয়ালের আড়ালে বসে থেকে অতিরিক্ত কোনো রোজগারের ঈপ্সা ছিলনা, থাকা সম্ভবও ছিলনা । এটা এক ধরনের আলস্য, পরিণামে কর্মবিমুখতা । সরকারি চাকরিতে, বা সরকারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত চাকরিতে কর্মবিমুখতার কোনো শাস্তি নেই, তাই তা শোধরানোরও কোনো উপায় নেই । বরং ব্যক্তিগত চেষ্টায় তা শোধরাতে গেলে নানান বিপত্তির সম্ভাবনা, এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণসংশয়ের কারণ । এই সামাজিক দূষণগুলির একক কারণ একটি সর্বজনস্বীকৃত নিয়ম যা পৌঁছে গেছে স্বয়ংসিদ্ধের পর্যায়ে, অথচ যা আদৌ সর্বজনস্বীকৃত নয় । কে বলেছে ভাল কাজ পেতে গেলে চাকরি স্থায়ী হওয়া দরকার, তাতে নাকি সংস্থার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে । বরং দেখা যাচ্ছে সংস্থার প্রতি আকর্ষণ বাড়ার বদলে বিকর্ষণই বেড়ে গেছে ।
সামাজিক দূষণের অভিঘাত সম্বন্ধে মানুষ, মানে কোনো কোনো মানুষ বহুকাল ধরে সচেতন এবং তা নানান ভাবে শাসন করবার চেষ্টা করা হয়েছে । স্বজ্ঞাপীঠ উদ্দীপন সকলের হয়না বলেই সমস্যা, আর চিন্তাটা একক প্রক্রিয়া । এই জন্য এককভাবে দেখতে গেলে ব্যক্তি স্বৈরাচারী, আত্মবিজ্ঞানবাদী বা প্রবাহে ভাসমান কুটোর ( চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস স্মরণীয়) মতো । এর মধ্যে প্রথম দুটি পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী । সর্বাধুনিক বিশ্বায়নের হিড়িক স্বৈরাচারকে করে তুলেছে আকাশছোঁয়া । আর সেই হিড়িকে যোগ দিয়েছে অনেক আত্মবিজ্ঞানবাদীও । স্বৈরাচারী আর আত্মবিজ্ঞানবাদী দুজনই দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে যে কথা বলেন সমাজ তাতে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । দুটিরই ইতিবাচক সমাধানের জন্য চাই সৎ, যুক্তিসম্মত চিন্তা যা সুস্পষ্ট বোধের কারণ, সমদর্শিতার প্রতি ন্যায়বদ্ধ, সদিচ্ছার পোষক, সুষ্ঠু ভাববিনিময়ের অনুশীলন এবং যুক্তিসম্মত অনুপূর্বিতা । প্রাকৃতিক পরিবেশে দূষণ নিয়ন্ত্রণের সব প্রচেষ্টা এগিয়ে না যাবার কারণ মানুষের সমাজে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দূষণের ক্রমিক বৃদ্ধি । এক শতক আগে মানুষের চিন্তারাজ্যে দূষণের যা মাত্রা ছিল আজ তা থেকে অনেক বেশি । প্রাকৃতিক পরিবেশে দূষণ বৃদ্ধির ফলে প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে । যদি মানুষের বিবর্তন শুধু প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলত তবে হমো সেপিয়েন্স্ সেপিয়েন্স্ উপপ্রজাতিরও বিলুপ্তি ঘটে যেত এতদিনে । কিন্তু মানুষের বিবর্তন চলছে মানসিক স্তরে । পারমাণবিক অস্ত্রে মানুষের সার্বিক বিনাশ বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিকে ভাবিয়েছে । গত অর্ধ শতকে একক ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ অনেক বেড়েছে । ২০০৮ সালে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ১৪০ কোটি ও মোবাইলের মাধ্যমে ৩৩০ কোটি একক মানুষের মধ্যে ভাববিনিময়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে । বর্তমান যুগের আগে বহু সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও তার মাত্রা স্বভাবতই অনেক কম ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪০-এ হেরোডোটাস তাঁর বর্ণনায় ভারতের কথা বিশেষ বলেননি, অর্থাৎ তাঁর কাছে এদেশের খবর পৌঁছয়নি ।
পূর্ববর্তী কোনো অনুচ্ছেদে আমরা বলেছিলাম মানুষের চিন্তা তার একক চিন্তা, সামগ্রিকভাবে সামজিক চিন্তা হয়না । কিন্তু এই অভূতপূর্ব যোগাযোগের একটি সুফল হল বিষয়ভিত্তিক (thematic) চিন্তার সমবর্তন (polarization) । এই সমবর্তন একটি অনন্য বাস্তব, যা আগে কখনও হয়নি । ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে অধ্যাত্মবাদ হয়না বলে যাঁদের ধারণা তাঁরা ধর্ম বলতে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মই বোঝেন । কিন্তু স্বজ্ঞা থেকে উৎসারিত জ্ঞান বা বুদ্ধিও তো অধি আত্ম, অর্থাৎ আত্মার উপরে তার স্থান । তাকে অধ্যাত্ম বলতে আপত্তি কেন ! এখানে আত্ম আর একক ব্যক্তি সমার্থক । সুতরাং নব্য অধ্যাত্মবাদে সামজিক দূষণ দূর হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা । ভূগোলকীয় উষ্ণায়ন যেমন এককথায় পরিবেশে বিশৃঙ্খলার সার্বিক কারণ, তেমনি সমবর্তিত চিন্তা হতে পারে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক, দু ধরনের পরিবেশেরই সংরক্ষণ এবং উন্নতি সাধনের সম্ভাব্য পথ । চিন্তার সমবর্তনের মধ্য দিয়েই আসতে পারে সামাজিক উপলব্ধি ।